বিশ্বজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ চরমে, ঠিক তখনই এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের এক তরুণ দম্পতি ইমরান রাব্বি ও আয়েশা আক্তার। তাঁদের আট মাস বয়সী সন্তান আয়ান খান রুহাবকে দেশের প্রথম ‘কার্বন নিরপেক্ষ শিশু’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন তাঁরা। রুহাবের জন্ম, চিকিৎসা, খাদ্য, পোশাক এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হবে—তা সামঞ্জস্য করতে তাঁরা নিজ এলাকায় ৫৮০টি গাছ রোপণ করেছেন। এই উদ্যোগ শুধু একটি শিশুর জন্য টেকসই সূচনা নয়, বরং গোটা জাতির কাছে এক শক্তিশালী বার্তা যে, প্রতিটি নবজাতকের জীবনই পরিবেশবান্ধবভাবে শুরু হতে পারে।
একটি শিশুর জন্ম যেমন আশা জাগায়, তেমনি সেটি এক প্রকার কার্বন ঘড়িকেও চালু করে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা নতুন জীবনকে আশীর্বাদ মনে করি, কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রতিটি নতুন নাগরিক আমাদের পরিবেশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, জলবায়ু ঋণ বাড়ায়। এমন এক দেশে যেখানে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি রয়েছে, সেখানে কার্বন নিরপেক্ষ শিশুর ধারণা কেবল আদর্শ নয়—এটি টিকে থাকার কৌশল।
একজন বাংলাদেশি গড়ে প্রতিবছর মাত্র ০.৫ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করেন, যেখানে উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা ১৫ টনের বেশি উৎপাদন করেন। অর্থাৎ, আমরা এই সংকটের মূল কারণ নই, বরং এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। প্রত্যেক মানুষের জীবনচক্রে খাদ্য, ভ্রমণ, জ্বালানি ও পোশাকের মাধ্যমে শত শত টন কার্বন নিঃসরণ হয়। বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশে এর মানে হলো, প্রতিটি নতুন জীবন মানে নতুন ঝুঁকি—সমুদ্রপৃষ্ঠে ডুবে যাওয়া জমি, অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা।
তাই কার্বন নিরপেক্ষ শিশুর উদ্যোগ শুধু পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার কর্মসূচি। নতুন প্রাণের আনন্দকে এখন রূপ দিতে হবে টিকে থাকার আন্দোলনে।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের জন্য জন্মদিনের আয়োজন, দামি পোশাক, কিংবা বিলাসবহুল গাড়ি কিনে দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে । অথচ একই অর্থ যদি কার্বন নিরপেক্ষ বিনিয়োগে ব্যয় করা যায়—তাহলে সেটিই হবে সন্তানের ভবিষ্যতের প্রকৃত সুরক্ষা। কার্বন নিরপেক্ষতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি নিরাপত্তা নীতি—যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং সবুজ উত্তরাধিকার তৈরি করে। এ বিনিয়োগ হতে পারে গাছ রোপণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে অর্থায়ন বা বিশুদ্ধ পানির প্রকল্পে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
অভিভাবকেরা চাইলে তাঁদের সন্তানের নামে একটি ‘ক্লাইমেট ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করতে পারেন—যেখানে অর্থ যাবে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝড়ের ক্ষতি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন শোষণ বাড়বে। এতে শিশুরাও শিখবে—পৃথিবীর সাথে ভারসাম্য রেখে বাঁচাই প্রকৃত দায়িত্ব, বিলাস নয়। কার্বন নিরপেক্ষ শিশুর ধারণা কেবল ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সফল হবে না। একে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে হবে—সরকার, এনজিও এবং নাগরিক তিন স্তরে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে।
সরকারের ভূমিকা : কার্বন অফসেট প্রকল্প বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা অভিভাবকদের কর রেয়াত দেওয়া। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘গ্রিন লিগেসি ফান্ড’ গঠন। পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও সার্কুলার ইকোনমি বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।
এনজিওর ভূমিকা : নিম্নআয়ের পরিবারদের শ্রমের বিনিময়ে কার্বন অফসেট সুযোগ দেওয়া—যেমন গাছের পরিচর্যা বা কম্পোস্টিং। ‘বেবি ফার্স্ট ফরেস্ট’ নামে ছোট পরিসরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা, যেখানে প্রতি মাসে অল্প টাকা দিয়ে নিজ এলাকায় গাছ লাগানো যায়।
নাগরিকের ভূমিকা : সামাজিক প্রচারণা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়া—যেমন #সবুজশিশু বা #BangladeshiGreenLegacy হ্যাশট্যাগে আন্দোলন গড়ে তোলা। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের এই উদ্যোগে যুক্ত করা। ‘জিরো ওয়েস্ট ফার্স্ট বার্থডে চ্যালেঞ্জ’ আয়োজনের মাধ্যমে অভ্যাস পরিবর্তনে উৎসাহ দেওয়া।
শিশুর জন্মের মুহূর্তেই তার পরিবেশগত ঋণ শূন্য করার উদ্যোগ নিতে হবে। কার্বন নিরপেক্ষ শিশুকে যদি জাতীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে আমরা শুধু নিজেদের সন্তানদের জলবায়ু সংকট থেকে রক্ষা করব না—বিশ্বকে দেখাতে পারব, সবচেয়ে ছোট ভুক্তভোগীরাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ত্রাণকর্তা।
এই আন্দোলন আমাদের শেখাবে, টেকসই জীবনযাপনই প্রকৃত দেশপ্রেম। একটি সবুজ, দায়িত্বশীল ও সহনশীল বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে আজ থেকেই শুরু হোক এই যাত্রা।
লেখক : শিক্ষক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
ই-মেইল: [email protected]

