বাংলাদেশি নারীদের বিয়ে করার বিষয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেছে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস। চীনে নারী-পুরুষ অনুপাতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ায় অনেক পুরুষ অন্য দেশ থেকে স্ত্রী আনার পরিকল্পনা করায় এটিকে কেন্দ্র করে একটি চক্র মানব পাচারে জড়িয়ে পড়েছে বলে এ সতর্ক বার্তা। ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের এ বার্তা পৌঁছে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার কুণ্ডা গ্রামের কোনাপাড়ায়। তাইতো পরিবারসহ এলাকাবাসীর শঙ্কা চীনের নাগরিক ওয়াং তাওজেন ও বাংলাদেশি নাগরিক সুরমা আক্তারকে ঘিরে।
প্রেমের টানে চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ওয়াং তাওজেন নামে এক যুবক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দা প্রেমিকার সঙ্গে রবিবার তার বিয়ে হওয়ার ছিলো। কিন্তু নানা জটিলতায় সেটি হয়ে উঠেনি। মঙ্গলবার নাগাদ সম্ভব হয়নি। তাইতো সুরমার ভাগ্যে কি আছে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
চীনা যুবক ওয়াং তাওজেন দেশটির হোয়ানান প্রদেশের বাসিন্দা। নাসিরনগরের ওই তরুণি হলো, উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের কুন্ডা কোনা পাড়া গ্রামের তাহের মিয়ার মেয়ে সুরমা আক্তার। তারা দু’জন এখন কুন্ডা গ্রামে অবস্থান করছেন।
আদালতে এসে বিয়ের এফিডেভিট করবেন- রবিবার সকাল থেকে সেই অপেক্ষা। দুপুরের পর জানা গেলো তারা স্থানীয় কাজী অফিসে বিয়ে করার জন্য দৌঁড়ঝাঁপ করে ব্যর্থ হন। সোমবার সকালে বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, স্বজনদের নিয়ে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে গেছেন। অপেক্ষা বিকেল নাগাদ।
শেষ পর্যন্ত জানা গেলো, বিয়ে পড়ানো যায়নি। আইনজীবীরা চীনা দূতাবাসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তাওজেন সোমবার স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, যার এফিডেভিট করা হয়েছে। তবে আইনজীবীরা এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে পড়াতে অসম্মতি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ওই দু’জনের বিয়ে হয়নি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কুন্ডাগ্রামের কোনাপাড়ায় অবস্থাকালে দিনভর চীনা নাগরিককেই নিয়ে যত আলোচনা। একটু পর পর লোকজন আসছে তাওজেনকে দেখতে। না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তবে বিকেল পৌণে পাঁচটার দিকে তাওজেন ও সুরমা আসতেই বাড়িতে ভিড় বাড়ে। লোকজন সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারের সদস্যদের। এ প্রতিবেদককে ফোনে সুরমার চাচা বাহার আলী জানিয়ে দেন, বাসায় ঢুকলে অপমানিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে বাসায় গিয়ে কথার ছলে সহজভাবেই অনেক কিছুই বলে ফেলেন বাহার আলী। দীর্ঘ সময়ের কথাতে সুরমার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কার কথা ফুটে উঠে। এজন্য তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রায় দেড় মাস আগে সুরমা ও তাওজেনের মধ্যে পরিচয়। ধীরে ধীরে প্রেম। ৩১ অক্টোবর চীনা যুবক বাংলাদেশে আসেন। সুরমাকে বিয়ে করতেই তার ছুটে আসা। প্রেমের টানে চীনা যুবক বাংলাদেশে চলে আসার ঘটনায় এলাকাতেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চীনা যুবককে দেখতে অনেকেই সুরমাদের বাড়িতে আসা শুরু করেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদেরকে নিয়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সুরমা জানান, তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। দেড় মাস আগে ‘ওয়াল টক’ নামে একটি অ্যাপস এর মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। এর পর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দুই পরিবারের সম্মতির মাধ্যমে তাদের বিয়ের বিষয়ে একমত হলে তাওজেন বাংলাদেশে আসেন। এয়ারপোর্ট থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। গত দু’দিন ধরেই তাদের বিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করছে পরিবার।
সুরমার সৎ মা নুরেনা বেগম জানান, তার মেয়ের ভালবাসা পেতে চীনের যুবক চলে এসেছে। মেয়েকে বিয়ে করতে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে বলে জানায়। সে অনুযায়ি সে মুসলমান হয়েছে। কিন্তু বিয়ের বিষয়টি সমাধান করা যায়নি। তবে সুরমার মা আফিয়া বেগম এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘সুরমা আমার মেয়ে হলেও সে হবু জামাইকে নিয়ে সৎ মায়ের বাড়িতে উঠেছে। তাই আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না কিংবা এ বিষয়ে কিছু জানারও চেষ্টা করি না।’
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ফেসবুকে এ নিয়ে অনেক লেখালেখি দেখতেছি। অনেকে বলতেছেন মেয়েদেরকে নিয়ে বিক্রি করা হয়। চীন নাকি অন্য দেশের মেয়েদেরকে বিয়ে না করতে বিবৃতিও দিয়েছে। এখন যদি আইনি সমস্যা হয় তাহলে সুরমার কি হবে সেই চিন্তা করতেছি।’
সুরমার মামা মো. তৌহিদ আলী বলেন, ‘আমার ভাগ্নির সঙ্গে সম্পর্কের টানে বিয়ে করতে চীন থেকে এক যুবক চলে এসেছে। আমরা তার কাগজপত্র পরীক্ষাসহ খোঁজ নিচ্ছি। বিয়ের জন্যও চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি তাদের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
সুরমার চাচা বাহার মিয়া বলেন, ‘রবিবার কাজী অফিসের মাধ্যমে তাদের বিয়ে পড়ানোর কথা ছিলো। কিন্তু কাজী এতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি আইনিভাবে এগুতে বলেন। সোমবার আদালতে গিয়ে এফিডেভেটের মাধ্যমে তাওজেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু বিয়ে পড়ানো সম্ভব হয়নি। আইনজীবীরা চীনা দূতাবাসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘একজন ছেলে তার প্রেমিকাকে বিয়ে করার জন্য চীন থেকে চলে এলো। দুই পরিবারই বিয়েতে রাজি। তাহলে কেন তাদের বিয়ে হবে না। তাওজেন একমাসের ছুটিতে এসেছে। সে আমার ভাতিজিকে নিয়ে যাবে বলেছে। এখন তাদের মধ্যে বিয়ে না হলে আমার ভাতিজির কি হবে। আমি এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।’
উল্লেখ্য, সতর্কবার্তায় চীনা নাগরিকদেরকে বিদেশি নারীকে বিয়ের ক্ষেত্রে নিজ দেশের আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহবান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ ম্যাচমেকিং এজেন্টদের এড়িয়ে চলতে এবং শর্ট ভিডিও প্লাটফর্মে প্রকাশিত আন্তসীমান্ত সংক্রান্ত ডেটিং বিষয়ক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দূতাবাস বলেছে, ‘বিদেশি স্ত্রী কেনা’র মতো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। বাংলাদেশে বিয়ে করার আগে ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করার আহবান জানানো হয়েছে।
পতাকানিউজ/বিপিবি/কেএস

