যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি (ইউএসএফ) ক্যাম্পাস ঘিরে দুই বাংলাদেশী শিক্ষার্থী -নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে বিস্ময়কর সব তথ্য ও সন্দেহজনক গতিবিধি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ এপ্রিল। পরদিন বিকেলে ইউএসএফ পুলিশ বিভাগের কাছে প্রথম অভিযোগ নিয়ে যান সহপাঠী ওমর হোসাইন। তিনি জানান, আগের দিন সকাল ১০টার পর থেকে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাহিদা সুলতানার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ওমর প্রথমে বৃষ্টিকে ফোন করেন, কিন্তু একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোন বন্ধ পান। পরে তিনি একই গ্রুপের আরেক বন্ধু জামিল আহমেদ লিমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। লিমনের ফোনও তখন বন্ধ ছিল।
এই অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওমর সরাসরি লিমনের বাসায় জায়গায় যান। অ্যাভালন হাইটস স্টুডেন্ট হাউজিং কমপ্লেক্সে গিয়ে তিনি দেখেন, লিমনের স্কুটারটি ঠিক আগের মতোই পার্ক করা আছে। তবে ভেতরে থাকা আরেক রুমমেট ঋষিত রাজ মাথুর জানান, তিনি লিমনকে সেদিন দেখেননি।
লিমনের ঘরের দরজায় বারবার টোকা দেওয়ার পরও কোনো সাড়া মেলেনি।
এদিকে আরেক বন্ধু নিশাত তাসনিম জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন ১৬ এপ্রিল তিনি বৃষ্টির সঙ্গে দুইবার কথা বলেন। তবে বিকেল পাঁচটায় দেখা করার পরিকল্পনা থাকলেও বৃষ্টি আর সেখানে উপস্থিত হননি।
ক্যাম্পাসে শেষ দেখা ও রহস্যজনক প্রস্থান
তদন্তে জানা যায়, ইউএসএফ ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ভবনে বৃষ্টির ব্যক্তিগত কিছু জিনিস পাওয়া যায় -যার মধ্যে ছিল আইপ্যাড ও টিফিন বক্স।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুপুরের কিছু পর বৃষ্টি ভবন থেকে বের হয়ে যান। শেষবার তাকে ক্যাম্পাসের উত্তর দিকে হাঁটতে দেখা যায়, মাথায় ছাতা নিয়ে।
এর পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
লিমনের ফোন ট্র্যাকিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
তদন্তকারীরা লিমনের ফোনের সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে দেখেন, ১৬ এপ্রিল বিকেলে তার অবস্থান ছিল ইউএসএফ ক্যাম্পাসেই। পরে সন্ধ্যার দিকে ফোনটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ে এলাকায় সিগন্যাল দেয়।
এরপর আরও কয়েক দফা ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায়, ফোনটি ক্লিয়ারওয়াটার বিচের উত্তরের স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় সক্রিয় ছিল। এই তথ্য তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে রুমমেট
পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব নেয় হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের গোয়েন্দা দল। তারা লিমনের আরেক রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তদন্তকারীরা লক্ষ্য করেন, তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, রান্নার সময় পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে কেটে গেছে। তবে এই ব্যাখ্যা তদন্তকারীদের সন্দেহ দূর করতে পারেনি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে আবুঘরবেহর ব্যবহৃত একটি হুন্দাই জেনেসিস গাড়ি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ে এলাকায় লাইসেন্স প্লেট রিডারে ধরা পড়ে। একই সময় লিমনের ফোনের অবস্থানও ওই এলাকাতেই ছিল।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাড়িটি ইউএসএফ এলাকা থেকে বের হয়ে কজওয়ে, ক্লিয়ারওয়াটার এবং স্যান্ড কি এলাকায় ঘুরে আবার টাম্পার দিকে ফিরে আসে।
প্রথমে আবুঘরবেহ দাবি করেন, তিনি মাছ ধরার জায়গা খুঁজতে গিয়েছিলেন। পরে আবার বলেন, লিমন ও বৃষ্টি তার গাড়িতে ছিলেন না। এরপর আবার বক্তব্য বদলে তিনি জানান, লিমন তাকে ডেকে নিয়েছিলেন এবং তিনিই তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন।
পরিষ্কার করার চেষ্টা ও রহস্যময় ক্রয়
গাড়িটি পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা জানান, সেটি সম্প্রতি খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এদিকে একই রাতে আবুঘরবেহ ও লিমনের বাসার কাছাকাছি একটি সিভিএস স্টোর থেকে পরিষ্কারক সামগ্রী কেনা হয়। রসিদে সময় ছিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিট। এর মধ্যে ছিল লাইজল ওয়াইপস, ট্র্যাশ ব্যাগ, ফ্লোর ক্লিনারসহ একাধিক জিনিস।

প্রথমে আবুঘরবেহ এসব কেনার কথা অস্বীকার করলেও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন ডেলিভারি ড্রাইভার এগুলো সংগ্রহ করেন। পরে ফোন রেকর্ডে ডোরড্যাশ অর্ডারের প্রমাণও পাওয়া যায়।
আবর্জনায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত
তদন্তকারীরা ফ্ল্যাটের ট্র্যাশ কম্প্যাক্টর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদ্ধার করেন। এর মধ্যে ছিল -লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা, বৃষ্টির গোলাপি আইফোন কেস, রান্নাঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম, একটি রুপালি ডাক্ট টেপ, যেখানে রক্তের দাগ পাওয়া যায়। ফরেনসিক পরীক্ষায় ওই রক্ত মানব রক্ত বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
ফ্ল্যাটজুড়ে রক্তের চিহ্ন
তদন্তে আরও ভয়াবহ তথ্য সামনে আসে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘর পর্যন্ত ছোট ছোট রক্তের দাগ পাওয়া যায়। কার্পেট, কাপড়, এমনকি দেয়ালের কিছু অংশেও রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। বিছানার নিচ থেকে ট্র্যাশ ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ উদ্ধার করা হয়।
নিখোঁজ হওয়ার পরের রাতেও চলাচল
ফোন রেকর্ড অনুযায়ী, ঘটনার পরদিন গভীর রাতে আবুঘরবেহ আবারও টাম্পা বে এলাকায় যান। তার রুট ছিল হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ হয়ে উত্তর সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত।
ডিজিটাল প্রমাণ ও চ্যাটজিপিটি ব্যবহার

আদালতের নথিতে আরও উল্লেখ আছে, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই আবুঘরবেহ অনলাইনে অস্বাভাবিক কিছু প্রশ্ন করেন। তিনি চ্যাটজিপিটিতে জিজ্ঞেস করেন, ‘একজন মানুষকে ডাস্টবিনে ফেলা যায় কি না’ এবং ‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়’। নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরও তিনি আবার একই ধরনের প্রশ্ন করেন।
তদন্ত এখন কোন দিকে
তদন্তকারীরা এখনো লিমন ও বৃষ্টির অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে উদ্ধার হওয়া আলামত, ফোন ট্র্যাকিং, গাড়ির গতিবিধি এবং ফরেনসিক ফলাফল মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি একটি গুরুতর অপরাধমূলক তদন্তে পরিণত হয়েছে।
আবুঘরবেহ একাধিকবার নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করলেও, তদন্তকারীরা বলছেন-ডিজিটাল ও ভৌত প্রমাণের সমন্বয় তার বক্তব্যকে ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মৃত’ শব্দটি ব্যবহার করেনি। বরং তদন্তকারী সংস্থা দুই শিক্ষার্থীকে ‘বিপন্ন’ ক্যাটাগরিভুক্ত করেছে। যারা ১৬ এপ্রিল থেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। মূলত, দুই শিক্ষার্থীর দেহের সন্ধান না পাওয়ায় ‘বিপন্ন’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।
-তথ্য সূত্র : টাম্পা বে টাইমস
-পতাকানিউজ

