কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এখন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতদিন প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত উন্নত চিপ, তথ্যভান্ডার কিংবা সফটওয়্যার। কিন্তু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘গণনাশক্তি’।
অর্থাৎ, বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রক্ষমতাই ধীরে ধীরে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই শক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে এবার গণনাশক্তিকে কেন্দ্র করে আলাদা বাণিজ্যিক বাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রযুক্তি ও অর্থনীতির জগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্লুমবার্গ টেকনোলজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক লেনদেন প্রতিষ্ঠান সিএমই গ্রুপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহৃত গণনাশক্তির জন্য বিশেষ ভবিষ্যৎভিত্তিক বাজার চালুর পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিলিকন ডাটা। বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে গণনাশক্তিও তেল, স্বর্ণ কিংবা বিদ্যুতের মতো আলাদা বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ যন্ত্রক্ষমতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মানুষের মতো লেখা তৈরি, ছবি বানানো, ভিডিও নির্মাণ বা জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করতে সক্ষম আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলো চালাতে হাজার হাজার উন্নত প্রসেসর একসঙ্গে কাজ করে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশাল আকারের তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করছে শুধু এই বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য। ফলে গণনাশক্তির চাহিদা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি এর ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের হার আরও বাড়বে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হবে। আর এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রেই থাকবে শক্তিশালী গণনাশক্তি। যে প্রতিষ্ঠান বা দেশ যত বেশি যন্ত্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তারা তত বেশি প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎভিত্তিক বাজার চালুর উদ্যোগকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণভাবে ভবিষ্যৎভিত্তিক বাজার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো পণ্যের ভবিষ্যৎ মূল্য আগেই নির্ধারণ করে চুক্তি করা যায়। এতে বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা ঘাটতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়। নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই নির্দিষ্ট মূল্যে প্রয়োজনীয় গণনাশক্তি নিশ্চিত করতে পারবে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে।
শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করেছে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রসেসর সংগ্রহে তাদের প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণে আগামী কয়েক বছরে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এমনকি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই খাতে অর্থ জোগাড় করতে আন্তর্জাতিক ঋণবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতে গণনাশক্তিই বিশ্বের নতুন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হতে পারে। একসময় যেমন তেলকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালিত হতো, এখন তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গণনাশক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতেও তার প্রভাব বেশি হবে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি উদ্বেগও বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে বহু প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে চাকরির ধরন বদলে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন মানুষের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে শুধু সফটওয়্যার ব্যবহার জানলেই হবে না, শক্তিশালী তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোও প্রয়োজন হবে। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দেশগুলো নতুন প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে গণনাশক্তিই ধীরে ধীরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠছে। আর এই শক্তিকে কেন্দ্র করে যে নতুন অর্থনৈতিক বাজার তৈরি হতে যাচ্ছে, তা আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে পারে।
তথ্য সূত্র : Bloomberg Technology
-পতাকানিউজ

