আলু চাষ করে বারবার লোকসানে পড়ে কৃষকরা যখন হতাশ, ঠিক সেই মুহূর্তে নতুন সবজি ‘বিটরুট’ নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে জয়পুরহাটের কৃষকদের। প্রথমবারের মতো বিটরুট চাষ করে বিঘা প্রতি লাখ টাকারও বেশি লাভ করেছেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর হাটশহর গ্রামের কর্ণপাড়া এলাকার কয়েকজন প্রান্তিক কৃষক।
তারা প্রায় ৮ বিঘা জমিতে প্রথমবারের মতো বিটরুট চাষ করে সফল হয়েছেন। তাদের এই সফলতার গল্প এখন আলু চাষিদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। চাষ পদ্ধতির আদ্যপান্ত জানতে বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা বিটরুট চাষ দেখতে ওই মাঠে ভিড় করছেন।
বিঘাপ্রতি মাত্র ১০-১২ হাজার টাকা খরচ করে কৃষকরা নতুন এই সবজি উৎপাদন করছেন ৯০ থেকে ১০০ মণ হারে। যা বিক্রি করছেন এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকায়। লাভ বেশি হওয়ায় বিটরুট চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত পুষ্টিকর হওয়ায় বিটরুট চাষে কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছেন জেলার কৃষি বিভাগ।
জেলায় এবার জয়পুরহাট সদর, ক্ষেতলাল ও পাঁচবিবি উপজেলায় বিটরুট চাষ হয়েছে প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে। বিঘা প্রতি এর চাষ খরচ মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর ফলন হয় ৯০ থেকে ১০০ মণের বেশি। অন্যান্য উপজেলায় বিক্ষিপ্তভাবে চাষ হলেও ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর হাটশহরের কর্ণপাড়া বিলে এবার বিটরুটের চাষ বেশি হয়েছে।
গত বছর কর্ণপাড়া বিলে বেসরকারি সংস্থা ‘এসো’র কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রদর্শনী ক্ষেত লাভজনক হওয়ায় কয়েকজন কৃষক উদ্বুদ্ধ হন এবং প্রায় ৮ বিঘা জমিতে এবারই প্রথম বিটরুট চাষ করে বাজিমাত করেছেন। রোপণের ৮০ দিন পর থেকে তারা বিটরুট বিক্রি করছেন। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ বিটরুট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা দরে। এতে এক বিঘা জমিতে বিটরুট চাষ করে খরচ বাদে কৃষকরা আয় করছেন লাখ টাকারও বেশি।

ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর হাটশহর গ্রামের অনীল চন্দ্র বলেন, ‘গত বছর বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল এহেড অর্গানাইজেশন (এসো) থেকে সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোরশেদুল ইসলাম তার ৬ শতক জমিতে প্রথম বিটরুটের প্রদর্শনী ক্ষেত করেন। এতে তার খরচ হয়েছিল এক হাজার ২০০ টাকা। ৮০ দিন পর সেই ক্ষেত থেকে তিনি বিটরুট বিক্রি করেছেন ১৮ হাজার টাকার।’
এই লাভ পেয়ে তিনি এবার এক বিঘা জমিতে বিটরুট চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে গড়ে এক হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ৬০ মণ বিটরুট বিক্রি করেছেন। জমিতে তার আরও ৪০ থেকে ৫০ মণের মতো বিটরুট আছে। যা বিক্রি করে খরচ ছাড়াই লাখ টাকারও বেশি লাভের আশা করছেন তিনি।
শুধু অনীল নন, তাকে দেখে ওই গ্রামের আচান, সরেন, কৃষ্ণ ও অর্জুন এবং পাশের ভুতপাড়া গ্রামের খগেন ও বাঘোপাড়ার তোজাম্মেলও এক বিঘা করে বিটরুট চাষ করে সফল হয়েছেন। রোপণের ৮০ দিন পর এখন প্রতিদিন তারা বগুড়ার মহাস্থান হাটে মণকে মণ বিটরুট বিক্রি করছেন।
আচান চন্দ্র বলেন, ‘গত বছর আলুতে লোকসানের পর আলু চাষ বাদ দিয়ে এবার বিটরুট চাষ করে অনেক লাভবান হয়েছি। এবারও আলুতে লোকসান। অথচ মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিটরুট চাষ করে আমার লাভ হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। এই ফল খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর।’ তিনি বলেন, প্রতিদিন বিটরুট চাষ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা তাদের জমিতে আসছেন। আগামীতে এই চাষ অনেক বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বেসরকারি সংস্থা এসো’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক কৃষিবিদ সলিল চৌধুরী বলেন, ‘গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে কৃষকদের লাভজনক ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়েই কৃষির জন্য উর্বর এ অঞ্চলে বিটরুট চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামীতে কৃষকরা এর সুফল ভোগ করবেন।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ. কে. এম. সাদিকুল ইসলাম জানান, নতুন সবজি বিটরুট চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন বলে তিনি শুনেছেন। বিটরুট চাষে কৃষকদের কারিগরি সহায়তাসহ সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
পতাকানিউজ/এসি

