অবশেষে ইসরায়েল ও হামাস বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো গাজার যুদ্ধ থামানো এবং জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তি দেওয়া। বৃহস্পতিবার থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধ থামার এই খবরটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এই চুক্তিগুলো সহজে স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি।
তাই যুদ্ধবিরতির এই ভিত্তি খুবই নড়বড়ে। গাজা পুনর্গঠন, জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আমেরিকার ভূমিকা, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চাপ এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ—এই সবকিছুই চুক্তিটিকে জটিল করে তুলবে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর।
নড়বড়ে চুক্তি, পুরনো খেলা
এখন যে শান্তি আলোচনার কথা বলা হচ্ছে, এটিকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা মনে করা যেতে পারে। কারণ অতীতে যতবারই এমন যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা কখনোই সমস্যার আসল সমাধান দেয়নি। বরং উভয় পক্ষই এই সুযোগে শুধু নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই নতুন চুক্তিও সংঘাতকে কেবল কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখবে, চিরতরে মিটিয়ে দেবে না।
গত দুই দশকে কী হয়েছে, তার কয়েকটি উদাহরণ:
২০০৮-২০০৯ (অপারেশন কাস্ট লিড): মিশরের মধ্যস্থতায় শান্তি এলেও গাজা অবরোধের মূল সমস্যা মেটেনি। এরপর আবারও সংঘাত হয়েছে।
২০১২ (অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স): ইসরায়েলের বিমান হামলার পর যুদ্ধবিরতি হলেও উত্তেজনা কমেনি, সমস্যার কারণও দূর হয়নি।
২০১৪ (অপারেশন প্রোটেকটিভ এজ): সাত সপ্তাহের সংঘাতের পর শুধু মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোন রাজনৈতিক শর্ত পূরণ করা হয়নি।
২০২৩-২০২৫ (চলমান যুদ্ধ): মানবিক সাহায্যের জন্য চুক্তি হলেও তা দ্রুত ভেঙে পড়েছে। এতে বোঝা যায়, মূল সংঘাতের সমাধান না হলে চক্রাকার যুদ্ধ থামানো কঠিন।
পুনর্গঠন: শুধু ইটের গাঁথুনি নয়
গাজায় এখন চলছে মানবিক বিপর্যয়। বাড়িঘর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু নতুন করে গড়তে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন এবং এতে সময় লাগবে কয়েক বছর। মনে রাখতে হবে, এই পুনর্গঠন শুধু নির্মাণকাজ নয়, এর সঙ্গে গভীর রাজনীতি জড়িয়ে আছে।
গাজাকে পুনর্গঠন করতে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন: প্রথমত, আন্তর্জাতিক সহায়তা যার যোগান আরব রাষ্ট্র, আমেরিকা ও ইউরোপকে দিতে হবে; অবরোধ প্রত্যাহার: ইসরায়েলের অবরোধ উঠে গেলে নির্মাণ সামগ্রী সহজে পৌঁছাবে; এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসন: ত্রানসহায়তা সুষ্ঠুভাবে বিলি করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রশাসন দরকার পড়বে যারা সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করবে।
আর যদি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সমস্যার সমাধান না হয় এবং দখলদারিত্ব চলতে থাকে, তবে পুনর্গঠন হবে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা। ধ্বংস আর সহিংসতার চক্র চলতেই থাকবে।
নেতানিয়াহু ও হামাসের চাপ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে চাপের মুখে আছেন। একই সঙ্গে তিনি হামাসের নিরস্ত্রীকরণের নিশ্চয়তা না পেলে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি করতে চাইছেন না, যা আবার হামাস মানতে নারাজ। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু তাঁর চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক শরিকদের চাপে আছেন, আবার আমেরিকার প্রত্যাশাও মেটাতে হচ্ছে—যা যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, হামাস সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও জিম্মি কৌশলকে ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ধরে রেখেছে। তারা এই বিরতিকে কাজে লাগিয়ে বন্দী মুক্তি, মানবিক সাহায্য নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে।
এই যুদ্ধবিরতি মূলত আমেরিকা, কাতার ও মিশরের কূটনৈতিক চেষ্টার ফল। উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তারা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হিসেবে আমেরিকা এমন একটি চুক্তি চাইছে, যা মানবিক উদ্বেগ মেটাবে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাবে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে চেষ্টা আমেরিকার ছিল, গাজার সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন তা পূনরায় শুরু করার চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এ যুদ্ধবিরতির ফলে জিম্মিরা মুক্তি পাবেন, সহিংসতা কমবে এবং গাজায় সাহায্য পৌঁছানো যাবে। তবে এই চুক্তি দীর্ঘদিনের সংঘাতের চক্র ভেঙে দেওয়ার সুযোগ সহসা তৈরি করবে, এমন আশা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
মোদ্দাকথা হল, স্থায়ী শান্তির জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোন বিকল্প নেই। এই যুদ্ধবিরতি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। তবে সংযম, দূরদর্শী নেতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া এটি খুব দ্রুতই ভেঙে যেতে পারে। এই চুক্তিকে দেখা যেতে পারে, রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখে ঔষধ দেওয়ার মত। কিন্তু রোগের মূল কারণ চিহ্নিত করছে না, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অবস্থার সমাধান করছে না। তাই বলা যায়, এটি স্থায়ী না হলে সামনে আরও বড় ধরনের সংঘাত অনিবার্য।
লেখক: চেয়ারম্যান ইনচার্জ, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

