দিনাজপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর দিক সম্প্রসারণে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এখবর পেয়েই অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের আশায় হামিদপুর ইউনিয়নের বাশপুকুর এবং কাজীপাড়া দু’টি গ্রামে বড় বড় বহুতল ভবন নির্মাণের ধুম পড়েছে।
‘সিঙ্গাপুর সিটি’, ‘বেগম পাড়া’, ‘গুলশান’, ‘বারিধারা’ নামে একাধিক এলাকা শহর গড়ে উঠছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ এবং দিনাজপুর জেলা প্রশাসন এঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
হামিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মিনহাজুল হক বুলবুল পতাকা নিউজকে বলেন, ‘কয়লা খনি উত্তর দিকে কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ করবে। বাজার মূল্যের চেয়ে ৫ গুণ বেশি জমির দাম দেবে। বাড়িঘর পাকা স্থাপনার ক্ষতিপূরণ সেই অনুপাতে পাওয়া যাবে। এই আশায় বাশপুকুর ও কাজীপাড়া এই দু’টি গ্রামে এ ধরণের বড় বড় অট্টালিকা ও পাকা দালান নির্মাণ হচ্ছে। অথচ এসব বাড়িতে যাওয়ার কোন সড়ক নেই। গত ২ বছর ধরে পাকা বহুতল ভবন তৈরি হচ্ছে। বাড়িগুলোর মালিক কারা, কোথাকার মানুষ, কি তাদের পরিচয়? পাশ্ববর্তী গ্রামের মানুষ বা এলাকাবাসী এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।’
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু তালেব ফারাজী বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় জরিপ বা সার্ভের কাজ চলছে। ড্রিলিং এর মাধ্যমে ৬টি বোর হোল করে ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত্ব সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তীতে ফেইস ডেভলপমেন্ট করতে প্রয়োজনীয় নকশা তৈরি করে ১ বছর আগে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীদের তালিকা সঠিকভাবে তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ১৩টি গ্রামে বসবাসকারীদের দিয়ে ৫০ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার আগেই খনির উত্তর দিকের গ্রাম দু’টিতে কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিশাল বিশাল পাকা দালান গড়ে তুলছে যা সত্যিই অবাক করার মত বিষয়।’

ছবি তোলা ভিডিও করা নিষেধ
খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ‘বিষয়টি পরিদর্শন করতে ২৭ আগস্ট দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জানে আলমসহএকাধিক কর্মকর্তা এবং এমডি নিজেসহ কয়লা খনির কর্মকর্তারা বাশপুকুর ও কাজীপাড়ায় যান। কিন্তু ভবন মালিকদের লোকজন কেউ মুখ খুলেনি। এমনকি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড্রোন দিয়ে ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করতে চাইলে এলাকাবাসী তুলতে দেয়নি। তাদের প্রতিরোধের মুখে সকলকে ফিরে আসতে হয়েছে।’
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. জানে আলম বলেন, ‘বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কাছ থেকে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় নকশাসহ প্রস্তাব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসেছে। বিষয়টি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। যাচাইবাছাই করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পর ফাইল ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হবে। প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন পেলে এলাকাবাসীর কাছে ৪ ধারায় নোটিশ পাঠানো হবে। নোটিশের প্রেক্ষিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।’ তারপরও অধিগ্রহণ নীতিমালা অনুযায়ী জরিপ জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কত দিন সময় লাগবে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান।’
দুই গ্রাম জুড়ে পাকা দালান নির্মাণের ধুম
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ঠিক উত্তর দিকে প্রায় ১ কিলোমিটারের মধ্যে বাশপুকুর এবং কাজীপাড়া দু’টি গ্রাম জুড়ে পাকা দালান নির্মাণের ধুম পড়েছে। অথচ গ্রামটিতে প্রবেশের ভালো কোনো সড়ক নেই।
বাশপুকুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ফসলি জমি ভরাট করে ২ শতাধিক বিশাল বিশাল অট্টালিকা ও পাকাবাড়ি গড়ে উঠেছে। বাশপুকুর গ্রামের পশ্চিম পাশে ধান ক্ষেত পেরিয়ে বাশপুকুর মৌজার কাজীপাড়া গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় দুই শতাধিক বসতি। এই গ্রামটি ঘুরে দেখা গেল, গ্রামটির শতকরা ৯০ ভাগ বাড়ি মাটির ছিল। গ্রামটির অধিবাসীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ আর চেহারা দেখে সহজেই বুঝা যায়, সকলে খেটে খাওয়া কৃষিজীবি নিম্ন আয়ের মানুষ। কিন্তু হঠাৎ করে তাদের সকলের হাতে যেনো গায়েবী বা লটারির টাকা এসেছে। মাটির বাড়িগুলো ভেঙে সকলে নতুন পাকা এমনকি দোতলা, তিনতলা বাড়ি তৈরি করেছে।
চোখে পড়ার মতো বিষয় হল, যে সব ইট দিয়ে গাঁথুনি বা খোয়া তৈরির কাজ হচ্ছে সব পুরোনো। গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেল, ১০ বছর আগে খনি এলাকায় ১০টি গ্রামের কৃষি জমি, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। মূল্য পরিশোধ করে খনি কর্তৃপক্ষ। সেই বাড়ির মালিকরা অন্য স্থানে চলে গেছে। বর্তমানে তাদের পরিত্যাক্ত ঘর বাড়ি ও মিল চাতালের ইট, কাঠ, রড তারা বিক্রি করছে বাশপুকুর ও কাজীপাড়ায় নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণকারীদের কাছে।
গ্রাম দু’টির রাস্তার ধারে সামান্য ফাকা জায়গায় ট্রাক্টর বোঝাই করে নিম্ন মানের ইট এনে জমা করা হচ্ছে। একইভাবে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়ি শহর থেকে ট্রাক্টর ও ভ্যান বোঝাই করে রড, সিমেন্ট, শাটারিং এর কাঠ, লোহার এ্যাংগেল, প্লাস্টিকের দরজা, জানালার গ্রিল পরিবহণের দৃশ্য দেখা গেছে।
সক্রিয় প্রভাবশালী দালাল চক্র
স্থানীয় হামিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ জানান, ‘কয়লা খনি জমি অধিগ্রহণ করবে । জমি ও বাড়ি ঘরের বাজার মূল্যের ৫ গুণ ক্ষতিপূরণ দেবে। সেই ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিতে এলাকায় একটি প্রভাবশালী দালাল শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তাদের সাথে যুক্ত আছে কয়লা খনি এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার একটি গ্রুপ। সকলের মিলিত কারসাজিতে গত প্রায় ১ বছরের বেশি সময় ধরে দুটি গ্রামে তৈরি হচ্ছে একের পর এক অট্টালিকা। কোন সাংবাদিক বা বহিরাগতদের গ্রাম দু’টিতে ঢুকতে দেওয়া হয় না। মোবাইল ফোনে বা ক্যামেরায় ছবি তুলতে বাধা দেয়া হয় না।’
চৌহাটি বাজারের মুদি দোকানদার আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা বাড়ি নির্মাণ করছেন এদের অনেকেই বহিরাগত। পরিচয়ও কেউ বলতে পারে না। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে ৫ শতক বা ১০ শতক জমি কিনে বাড়ি করেছেন। এলাকায় সর্বোচ্চ জমির মূল্য চলছে ৩০ হাজার টাকা শতক। কিন্তু তারা জমির মালিকদের কাছ থেকে শর্ত সাপেক্ষে প্রতি শতক ২ থেকে ৩ লাখ টাকা দামে দলিল করে বা লিজ নিয়ে বিশাল বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করেছেন।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়লা খনির ক্ষতিপূরণ পাওয়া সাপেক্ষে ক্রেতা এবং লিজ গ্রহীতারা মালিককে জমির মূল্য পরিশোধ করবে। আর বাড়ি বা ভবনের দাম ওই ব্যবসায়ীরা নেবে এই শর্তাধীনে এলাকায় পাকা ভবনগুলো তৈরি হচ্ছে।
২ দশকে জমির দাম বেড়েছে ৪ গুণ
হামিদপুর ইউনিয়নের স্কুল শিক্ষক আমিরুজ্জামান বলেন, ‘কয়লা খনির কারণে গত ২ দশকে এলাকার জমির দাম ৪ গুণ বেড়ে গেছে। ২০ বছর আগে খনি এলাকার ৫০ শতকের এক বিঘা জমির দাম ছিল সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা। গত ২০০৬ ও ২০০৭ সালে খনি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের আন্দোলনের মুখে খনি কর্তৃপক্ষ ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে। সেই সময় প্রতি শতক জমির মূল্য এক লাখ টাকা হিসেবে পরিশোধ করে। বাড়িঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনার মূল্য বাবদ তৎকালিন বাজার মূল্যের চেয়ে চারগুণের অধিক টাকা পরিশোধ করে পেট্রোবাংলা। সেই থেকে এলাকায় একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র তৈরি হয়েছে। কয়লা খনির ফিল্ড অফিস এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার একটি চক্রের সাথে তারা লিঁয়াজো রক্ষা করতে থাকে।’
শিক্ষক আমিরুজ্জামান বলেন, ‘কয়লা খনি কোন এলাকায় সম্প্রসারিত হবে এবং কোন মৌজার জমি অধিগ্রহণ করা হবে তা এই গ্রুপটি আগেই জানতে পারে। এরপর শুরু হয়ে যায় তোড়জোড়। তারা সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের বাজার মূলের চেয়ে তিনগুণ দামে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এর উপরে চুক্তি করে জমির বায়নানামা করে নেয়। এরপর স্থানীয় ভূমি অফিসের মাধ্যমে জমির খাজনা-খারিজ এবং সেটেলমেন্ট অফিস থেকে মাঠ পর্চা খতিয়ানসহ জমির মালিকানার সকল কাগজ প্রস্তুত করে ফেলে।’
দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের জমি হুকুম দখল কর্মকর্তা নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির প্রয়োজনে বিভিন্ন দফায় মোট ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন ২০১৭ অনুযায়ী জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট মৌজার জমি গত ৩ বছরে যে দামে বিক্রি হয়েছে তার গড় হিসেব করে অধিগ্রহণকৃত জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ ও পরিশোধ করা হবে বলে তিনি জানান।’
পতাকানিউজ/এএস/এমওয়াই/কেএস

