একটি দেশের আর্থিকখাতের মুল ভিত্তি ব্যাংক। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ব্যাংকিংখাত ঘিরে। সরকারি এবং বেসরকারিখাতের ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি তরান্বিত করে।
এখন দেশের উন্নতির পরিবর্তে ব্যাংকের টাকা কিভাবে লুট হলো, সেই চিত্র প্রকাশ পেয়েছে জাতীয় সংসদে। দেশের অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তালিকার ২০টি প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রাম ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের নাম। আবার সবকটি প্রতিষ্ঠানই এস আলম শিল্পগ্রুপের আওতাধীন। অর্থ্যাৎ, সর্বাধিক টাকা হরিলুট হয়েছে এস আলমের হাত ধরেই।
তালিকাটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংসদে প্রথম উত্থাপিত হলেও এটি নতুন তালিকা নয়। মানে, শীর্ষ ঋণখেলাপির তথ্য সংসদে উত্থাপনের চিত্র পুরনো। অতীতেও এমন তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ঋণ আদায় বা শিল্পগ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার চিত্র হতাশাজনক। ফলে ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ হলেও এর সুফল বা টাকাগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা দ্রুত সম্ভব হবে-এমনটা আশা করা কঠিন।
অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশে আরও ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। এই সংখ্যা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ব্যাংকিংখাতকে কতোটা দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষ ঋণখেলাপি শিল্পগ্রুপগুলো সরকার তথা ক্ষমতাশালীদের কাছ থেকে নানাভাবে সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে তারা আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই বেরিয়ে যায়। আর রাষ্ট্র খেলাপিঋণের পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনবে মর্মে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে টাকা ফেরত এসেছে এমন তথ্য দুর্লভ।
কিন্তু খেলায় করলেই দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণের কিস্তি দিতে সামান্য দেরি করলেই আইনি জটিলতায় পড়েন, ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন, সামাজিকভাবে হেয় হন। অথচ বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি করেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বড় অংশ নানা সুবিধা ভোগ করে চলেছে। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক সংকটও তৈরি করছে। যখন সাধারণ মানুষ দেখেন যে নিয়ম সবার জন্য সমান নয়, তখন আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সরকার এরই মধ্যে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। আপাতত দৃষ্টিতে এটি আকাঙ্ক্ষিত ও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, যে অর্থনীতির শিরায়-উপশিরায় খেলাপি ঋণের বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির পথ এত সহজ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, ভূরাজনৈতিক চাপ-সব মিলিয়ে সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ ব্যাংক খাতের বিপুল অর্থ যদি সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে আটকে থাকে, তবে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক।
আরও পড়ুন :
‘আস্থার প্রতীক’ ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে হঠাৎ কী হলো?
এখানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই অনাদায়ী থাকছে এবং পাচার হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার আর্থিক ভিত্তি দৃঢ় ও আত্মনির্ভরশীল হয়। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে সেই ভিত্তি কখনোই মজবুত হবে না।
বিএনপি সরকার ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে। প্রায় দুই মাস হতে চলেছে সরকারের বয়স। আপাততঃ শিশু বয়সী সরকার হলেও এই সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো তাত্ত্বিক সমাধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এই গভীর সংকট মোকাবিলায় সেগুলো যথেষ্ট নয়। কেবল তালিকা প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং এটিই হওয়া উচিত কঠোর পদক্ষেপের সূচনা।
সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া মানে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। এটি কেবল অর্থনীতির জন্য নয়, আমানতকারীদের জন্যও বড় হুমকি। মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের অর্থ মূলত সাধারণ মানুষের আমানত। সেই অর্থ যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে—আর আস্থা হারালে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান টিকতে পারে না।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন পূরণের দৌঁড় পূরণ হবে তো?
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত তাই আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা-এসব কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী বার্তা: আইন সবার জন্য সমান।
নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। সাধারণ আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া উন্নয়নের কোনো রূপরেখাই সফল হবে না।
সরকার যদি সত্যিই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে শুরুটা করতে হবে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে। অন্যথায় খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অর্জনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করবে-আর ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন থেকে যাবে কেবল কাগজে-কলমে।
বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকার বড়ধরনের শাস্তির ঘোষণা এখনো দেয়নি। পাচারের টাকা ফিরিলে আনার বিষয়ে সরকারের কণ্ঠ এখনো মিনমিনে। রণহুংকার দিয়ে পাচারের টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ এবং শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্যোগ কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও ঋণখেলাপির সংখ্যা বাড়ার শঙ্কা থেকেই যাবে। কারণ, বড় ঋণখেলাপিরা তখন ধরেই নেবে, ‘সরকার জনগণকে শুনানোর জন্য কিছু ফাঁকা বুলি আওড়ায়, বাস্তবে আমরাও সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলে কিছু কড়ি দিই, ফলে আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের ভেতরে থাকা ঘনিষ্ঠ মহলের।’
সেই বিবেচনায় সরকার যদি এখন থেকেই ঋণখেলাপি শিল্পগ্রুপগুলোর কাছ থেকে ঋণআদায়ে কড়াকড়ি আরোপ করে, তাহলেই সরকারের কণ্ঠস্বরের বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও বুঝবেন, শুধু সবসময়ই ক্ষুদ্র ও মাঝারিরাও আইনের আওতায় আসেন না, বড়রাও আসেন। বড় সুফল হবে, বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের ওপর আস্থা ফিরে পাবেন, তারা ব্যাংকে সঞ্চয় করতে উৎসাহিত হবেন। এই আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব একান্তই সরকারের। সরকারকে অবশ্যই সেই দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এর বিকল্প নেই।
-পতাকানিউজ

