ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা। দলটি ইতিমধ্যে ২৩৬টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণা প্রকাশের পরপরই পাল্টে গেছে মাঠের রাজনীতি। ধানের শীষের সম্ভাব্য মনোনীতরা বিভিন্ন জনপদে দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন—কখনো জমির আলপথে, কখনো টং দোকানে কিংবা স্থানীয় বাজারে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন, নিজেদের পরিকল্পনা জানাচ্ছেন এবং নির্বাচিত হলে কী করবেন, সে প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।
বিএনপির নেতৃত্ব বলছে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি সারাদেশে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য, ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে এমন এক গণজোয়ার সৃষ্টি করা, যা তাদের আবারও সরকার গঠনের অবস্থানে দাঁড় করাতে পারে।
এই লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্রীয়ভাবে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশজুড়ে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক ছয় দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, এই মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। উপদলগুলো—যুবদল থেকে শুরু করে ছাত্রদল—বিভিন্ন জায়গায় সভা, মতবিনিময় ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাশাপাশি সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে অতীতে বহিষ্কৃত তিনশর বেশি নেতাকর্মীকে। তাদের যুক্তি, নতুন রাজনৈতিক কৌশল এখন সংগঠনের ঐক্য ও শক্তি পুনর্গঠনের ওপর জোর দিচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির হাইকমান্ড ‘ধানের শীষ’কে শুধু একটি প্রতীক হিসেবে নয়, বরং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। নির্বাচন ঘিরে প্রতিপক্ষের বাধা বা নির্বাচন-পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দলটি এসব অতিক্রম করেই সামনে অগ্রসর হতে চায়।
গতকাল শুক্রবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নির্বাচন মানেই লড়াই ও প্রতিযোগিতা। আমরা ধানের শীষের পক্ষে আবারও ঐতিহাসিক গণজোয়ার তৈরি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অতীতেও জনগণের বিপুল ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনা করেছে। এবারও চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম ধানের শীষের প্রতি তাদের সমর্থন জানাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
নতুন ছয় দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার মূল বিষয়গুলো কীভাবে আরও বোধগম্য করে জনগণের সামনে তুলে ধরা যায়, সেটাই আমাদের গুরুত্ব। কৃষি, শিক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড, যুব কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবাসহ যে সব প্রতিশ্রুতি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিয়েছেন—এসবই কর্মসূচিতে আলোচনার মূল বিষয় হবে।’
২০০৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনে বিএনপি। কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, তাদের নতুন পরিকল্পনায় মূল ফোকাস রাজধানীকে কেন্দ্র করে রাজনীতি না করে সেটিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে ইতিমধ্যে ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন বিভাগে, যেখানে নীতিনির্ধারকরা তথ্যভিত্তিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
বিএনপির নেতারা মনে করেন, সাম্প্রতিক আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। তারা এই আস্থাকে জনসমর্থনে রূপান্তর করতে চায় নির্বাচনমুখী সব কর্মসূচির মাধ্যমে।
অন্যদিকে, ৬ দিনের কর্মসূচির বিস্তারিতও চূড়ান্ত হয়েছে। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ঘরোয়া পরিবেশে এই কর্মসূচিগুলো পালন করবে। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ওলামা দল, যুবদল ও কৃষকদল পর্যায়ক্রমে অংশ নেবে। প্রতিটি আয়োজনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান বলেন, ‘এই কর্মসূচি মূলত প্রশিক্ষণভিত্তিক। ৩১ দফার মধ্যে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে—ফ্যামিলি কার্ড, যুব কর্মসংস্থান, ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা ইত্যাদি।’
সংগঠনের ঐক্য ফেরাতে বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার—এসবই একত্রে দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করছে। রুহুল কবির রিজভী জানান, ‘যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির বার্তা দিচ্ছে।’
নির্বাচনের প্রচারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ, মাঠে সভা-সমাবেশ এবং রোডমার্চ—সব মিলিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের এলাকায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপুল বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপি জনগণের মাঝে ছুটে যাচ্ছে। নির্বাচন সামনে, আর অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে জানিয়েছে। তাই আমাদের প্রস্তুতি এখন পূর্ণমাত্রায় চলছে। ধানের শীষের জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনগণের সমর্থনে বিএনপি আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসবে।’
পতাকানিউজ/এনটি

