বাংলাদেশে অবশেষে গণতন্ত্র ফিরেছে। নানা শঙ্কা, উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে, একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর দেশে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার অন্যতম অবদান রেখেছেন দুই জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
এই দু’জনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া দেশের ইতিহাসে এ ধরনের সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হত না। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিভেদ, মতবিরোধ, মব সন্ত্রাস এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে দেশের নানা মহলে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। অধ্যাপক ইউনূসকে নিয়ে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কেউ কেউ বলেছিলেন তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। সেনাবাহিনী নিয়েও অযথা গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে সেনাপ্রধান দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ড. ইউনূস নিজের নীরবতা ও সংযমী ভূমিকার মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা দেখিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ভোট ডাকাতি বা সহিংসতার কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, দেশের প্রতিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ফলে দেশ এবং বিদেশে অধ্যাপক ইউনূস ও জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ভূমিকার প্রশংসা হচ্ছে। অনেকেই তাদের গণতন্ত্রে উত্তরণের মহানায়ক হিসেবে অভিহিত করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেড় বছরের ব্যবধানে তিনি সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতি, খালি ব্যাংক, বিদেশি পণ্যের আমদানি ও ডলার সংকট, পুলিশ বাহিনীর মানসিক ভেঙে পড়া এবং যুবসমাজ ও স্বৈরশাসনে ক্ষতিগ্রস্তদের তীব্র ক্রোধ—এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে ড. ইউনূস এবং তার নেতৃত্বাধীন দল দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছেন।
সরকারের দায়িত্ব ছিল মূলত তিনটি
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যবস্থা করা, রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন এবং নির্বাচন সম্পন্ন করা। এ তিনটি দায়িত্বই তারা সফলভাবে পূরণ করেছেন। নির্বাচনের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা ছিল। পুলিশ নিষ্ক্রিয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থান ভোটকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে এক কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। নির্বাচনে প্রায় এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, যা দুর্বৃত্তদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করেছে এবং শান্তিপূর্ণ ভোটে সহায়তা করেছে।
নির্বাচনের দিন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় ঐতিহাসিক। ভোট দিয়ে আপনার অধিকার বুঝে নিন এবং পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলুন।’ তিনি আরও জোর দেন, কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি, কেন্দ দখল বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না।
সেনাপ্রধানও ভোটকেন্দ্রে নিজের দায়িত্ব পালন শেষে বলেন, ‘দেড় বছর ধরে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করেছি। সবাইকে অনুরোধ করছি, নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোট দিন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।’
শেষপর্যন্ত, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের গণতন্ত্রের পথে যাত্রায় যে অবদান রেখেছেন, তা কেবল বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাদের নেতৃত্ব ও দায়বদ্ধতা ছাড়া দেশকে স্মরণকালের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরণের স্বাদ পাওয়া সম্ভব হত না।
-পতাকানিউজ

