হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন কে? নিঃসন্দেহে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান হরমুজ ছেড়ে কথা বলছে না। ফলে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী ইরান থেকে মুক্ত করতে পারছেন না। তাই ট্রাম্পের গলার কাটা হয়ে উঠেছে হরমুজ।
গলায় কাটাবিদ্ধ বেচারা ট্রাম্প রোজকার মতো নিজের ট্রুথ সোশ্যালের আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন -এবার হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেবেন! কী ভয়াবহ চিন্তা ট্রাম্পের?
হরমুজ বন্ধ হলে পুরো বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল কোন পথে পরিবাহিত হবে? ট্রাম্প সেই ফর্মুলা বাতলে দিতে পারছেন না। যা পারছেন, ওই মোবাইল ফোনে আঙ্গুল চালান এবং নিজের ট্রুথ স্যোশাল। হুমকি-ধমকি।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরালের যৌথ প্রযোজনায় ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করতে ২৮ ফেব্রুয়ারি যে হামলা চালানো হলো, সেই হামলায় বিশ্ব এখনও টালমাটাল। ৩৮ দিনের যুদ্ধ শেষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতি টেনেছেন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পাকিস্তানকে দুতিয়ালি করার দায়িত্ব দিয়ে ট্রাম্প ইরানের টুটি চেপে ধরে একটি চুক্তি করতে চেয়েছিলেন।
পাকিস্তানও নিজদের দুতিয়ালিকে বেশ আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ক্রীড়ানকের ভূমিকা অবতীর্ণ হয়ে প্রাথমিক সফলতা দেখিয়েছিল যুদ্ধরতদের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দেওয়ার মতো চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়ে।
কিন্তু ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে একটি চুক্তির জন্য যে বৈঠক আয়োজন হলো, সেটি কার্যত নিস্ফল হলো। মানে, স্থায়ী যুদ্ধ বিরতি হলো না। ফলে আবারও যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা জাগ্রত রইল।
এমন শঙ্কায় যখন পুরো পৃথিবী যখন তটস্থ, তখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি দোষারাপে মত্ত আছে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি করছে এবং আলোচনার টেবিলে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতে পারেনি।
আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেসব বিষয়ে ছাড় দিতে যুক্তরাষ্ট্র রাজি নয়, সেগুলো ইরানকে জানিয়েছে। এতে ইরান রাজি হয়নি।
আলোচনা ভেস্তে গেল। টেবিল এখন ফাঁকা। বন্দুকের ট্রিগারে দুপক্ষের আঙ্গুল রাখা। ইশারা দিলেই টান পড়তে পারে ট্রিগারে।

এমন হতচকিত সময়ে ট্রাম্প কী করবেন? -এটিই এখন মূল প্রশ্ন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এ পোস্ট দেন। অবশ্য, এর মাধ্যমে এই সামাজিক মাধ্যমটির ব্যবহার ও আর্থিকমূল্য বাড়ানোর একটি চেষ্টা বণিক প্রেসিডেন্টের আছে বলে অনেকেই মনে করেন।
যাই হোক, ট্রাম্প এখন সেই ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট দিয়েছেন, এবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই জাহাজ চলাচল করতে দেবে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে অবরোধ দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্পের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সবাই ঢুকতে পারবে, বেরও হতে পারবে-সেই অবস্থায় পৌঁছতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরান সেটি হতে দিচ্ছে না। এই কারণেই তিনি যেসব জাহাজ ইরানকে টোল দিয়ে হরমুজ পাড়ি দেবে, সেগুলোকে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
ইরান শুরু থেকেই দাবি করছে, হরমুজ প্রণালিতে তারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং এখন টোল দিয়েই জাহাজগুলোকে হরমুজ পাড়ি দিতে হবে।
ইরানের এমন ঘোষণাতেই বেজায় চটেছেন ট্রাম্প। তিনি ইরানকে টোল আদায়ের সুযোগ না দিতেই তৎপর হয়েছেন। কিন্তু হরমুজ পাড়ি দিতে না পারলে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল কোন পথে গন্তব্যে পৌঁছাবে সেটা বলতে পারছেন না ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে হরমুজ বন্ধ। তাই পুরো বিশ্বেই শুরু হয়েছে জ্বালানি সংকট। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় খোদ আমেরিকানরাই ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত।

এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধজ্ঞা জারির হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বিশ্বের জ্বালানি সংকট আরো ঘণীভূত করতে চাইছেন, এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
তাহলে ট্রাম্পের সামনে আর কি পথ খোলা আছে? একটু চিন্তা করলেই সামনে আসে ২১ এপ্রিল। যুদ্ধ বিরতি শেষ হলে পুনরায় কঠোরভাবে হামলা হবে-এমন হুমকি দিতে পারেন ট্রাম্প। কিন্তু নিজের গদি যেখানে নড়বড়ে সেখানে ট্রাম্পের এমন হুমকিকে ইরান কতোটা তোয়াক্কা করবে-সেটা দেখার বিষয়।
হরমুজ সংকট
আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার যে হুমকি ট্রাম্প দিচ্ছেন তা শুধু ইরান কেন? পুরো বিশ্ব নেতৃত্বই হয়তো ট্রাম্পকে ‘নতুন পাগল’ ডাকবেন সেটা হয়তো ট্রাম্প ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাকি নেতৃত্ব ভালো করেই অনুাধাবন করবে।
কারণ, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দিলে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করবে বাড়বে। বিশ্বজুড়ে সারসহ গুরুত্বপূর্ণ সব জিনিসের মারাত্মক ঘাটতি হবে, শেয়ারবাজারে পুনরায় ধস নামবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি এরই মধ্যে ৩ দশমিক ৩ এ উঠছে। এটি নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছবে সেটা নাইবা বললাম।

এমন বাস্তবতায় বলা চলে, ইরানের হাতে থাকা তরুপের তাস এবং ট্রাম্পের গলার কাটা- ওই একটিই। হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প এই কাটা সরাতে গেলেও বিপদ, আর সরাতে না পারলেও বিপদ। উভয় সংকটে পড়েছেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদ আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমা মেরে নিজদের জয়ী ভাবছে। আর সরকার এখনো ঠিকে আছে-এটা ভেবে ইরান নিজদের জয়ী ভাবছে। ফলে আলোচনার টেবিলে শান্তি খোঁজার চেয়ে স্ব স্ব অবস্থানে দুটি দেশ নিজদের জয়ী ভাবতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
পাকিস্তান অবশ্যই দুতিয়ালি বজায় রাখতে চায়। দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুদ্ধ বিরতির পর চুক্তির বিষয়ে এখনো ভূমিকা রাখার পক্ষে দেশটি।
আর আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরান এরই মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপ করেছে। রাশিয়া যথারীতি ইরানের পাশে থাকার কথা বলেছে। নিশ্চয়, চীনও ইরানকে ছেড়ে যাবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে ভর করে যুদ্ধ শুরু করা ইসরায়েল এখন নতুন ফন্দি করতে নিশ্চয় ব্যস্ত। কারণ, ২১ এপ্রিলের পর হয়তো পুনরায় বোমাবাজি শুরু করা যাবে। কিন্তু ইসরায়েলের জনগণই মনে করে না, এই যুদ্ধে ইসরায়েল জয়ী হয়েছে। বরং আলোচনার টেবিলে ইসরায়েলকে বাদ দেওয়ায় সেই দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ। কারণ, এতে প্রমাণিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনায় ইসরায়েল অর্বাচীন দেশ।
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা
-পতাকানিউজ

