ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চালু হয়েছে, যা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রায়শই ‘জেনোসাইডাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই যুদ্ধে অফিসিয়াল সূত্রে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭ হাজার ১৭৩-এর মতো রক্ষণশীল অনুমান দেখানো হলেও, জার্মানির খ্যাতনামা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চের সাম্প্রতিক গবেষণা এই চিত্রকে সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়েছে।
চলতি নভেম্বরে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে (৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ৬ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত) গাজায় অন্তত ১ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যা অফিসিয়াল পরিসংখ্যানের চেয়ে ৩৫-৪১% বেশি। এই রিপোর্টটি শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের উপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরিসংখ্যানগত মডেলিংয়ের মাধ্যমে এই অনুমান তৈরি করেছে, যা যুদ্ধের মানবিক মাত্রা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাটি জার্মান সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ডাই জাইট’-এর প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি যুদ্ধের অন্ধকার অংশগুলো—যেমন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লাশ বা অপ্রকাশিত মৃত্যু—আলোকিত করেছে।
গবেষণার পদ্ধতিগত দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি শুধুমাত্র একক উৎসের উপর নির্ভরশীল নয় বরং একটি বহুস্তরীয় বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের গবেষকরা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল তথ্যের পাশাপাশি স্বাধীন পরিবারভিত্তিক জরিপ (যেমন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন এবং প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের জরিপ), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মৃত্যুসংবাদ এবং পূর্ববর্তী পিয়ার-রিভিউড গবেষণা (যেমন ‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নালের ২০২৪-এর প্রতিবেদন) থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এই তথ্যগুলোকে পরিসংখ্যানগত এক্সট্রাপোলেশনের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে লিঙ্গ (পুরুষ-নারী) এবং বয়সভিত্তিক (বিভিন্ন বয়সের গ্রুপ) পার্থক্য বিবেচনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নারীদের মৃত্যু প্রায়শই পুরুষদের তুলনায় কম নথিভুক্ত হয় এবং ৬০ বছরের উপরে বয়সীদের তথ্য প্রায়ই বাদ পড়ে যায়, যা গবেষণায় সংশোধিত হয়েছে। এই পদ্ধতিটি অক্টোবরে ‘পপুলেশন হেলথ মেট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং শুধুমাত্র যুদ্ধ-সরাসরি মৃত্যু (প্রধানত বোমা হামলা) গণনা করেছে, পরোক্ষ মৃত্যু (যেমন রোগ বা অপুষ্টি) অন্তর্ভুক্ত নয়। গবেষণার কো-লিডার ইরিনা চেন বলেছেন, ‘সঠিক মৃতের সংখ্যা আমরা কখনোই জানতে পারব না। আমরা শুধু যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত একটি অনুমান করতে চেষ্টা করছি।’ এই পদ্ধতি যুদ্ধকালীন পরিসংখ্যানের অসঙ্গতি মোকাবিলা করার জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য।
গবেষণার মূল ফলাফলগুলো ভয়াবহতার একটি চিত্র তুলে ধরেছে, যা অফিসিয়াল সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে গাজায় ৯৯ হাজার ৯৯৭ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৫ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যবর্তী অনুমান ১ লাখ ১২ হাজার ৬৯। এর মধ্যে প্রায় ২৭% (প্রায় ৩০,০০০) শিশু (১৫ বছরের কম বয়সী) এবং ২৪% (প্রায় ২৭,০০০) নারী, যা দেখায় যে যুদ্ধের শিকার প্রধানত সিভিলিয়ান এবং দুর্বল অংশ। এই ডেমোগ্রাফিক ব্রেকডাউনটি জাতিসংঘের পূর্ববর্তী জেনোসাইড-সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণের সাথে মিলে যায়, যেখানে যুবক পুরুষদের মৃত্যুর পরিবর্তে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর উপর প্রভাব বেশি। তুলনামূলকভাবে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৬৭ হাজার ১৭৩ মৃত্যুর হিসাবটি শুধুমাত্র নিশ্চিত কেস (হাসপাতাল রেকর্ড বা পরিবারের রিপোর্ট) গণনা করে, যা যুদ্ধের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা লাশের কারণে অসম্পূর্ণ। গবেষণায় কোনো পরিসংখ্যানগত কারচুপির প্রমাণ পাওয়া যায়নি, বরং এটি রক্ষণশীল অনুমান হিসেবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সাইড থেকে ১ হাজার ৯৮৩ মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছে, যা যুদ্ধের অসমতুল্যতা তুলে ধরে। এই ফলাফলগুলো শুধু সংখ্যা নয়, বরং যুদ্ধের মানবিক মাত্রা বোঝায়, যেখানে শিশু এবং নারীদের উপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি গাজার জীবনযাত্রার ধ্বংসাত্মক চিত্র তুলে ধরেছে, বিশেষ করে গড় আয়ু (লাইফ এক্সপেকটেন্সি) এর ক্ষেত্রে। যুদ্ধের আগে গাজায় নারীদের গড় আয়ু ছিল ৭৭ বছর এবং পুরুষদের ৭৪ বছর, কিন্তু ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী এটি নেমে এসেছে যথাক্রমে ৪৬ এবং ৩৬ বছরে। এটি একটি পরিসংখ্যানগত প্রজেকশন, অর্থাৎ যদি যুদ্ধের বর্তমান তীব্রতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ফিলিস্তিনিরা গড়ে এই বয়স পর্যন্তই বাঁচতে পারবেন। এই হ্রাসের কারণ হলো সরাসরি হামলার পাশাপাশি পরোক্ষ প্রভাব যেমন স্বাস্থ্যসেবার ধ্বংস, অপুষ্টি এবং রোগের বিস্তার। ‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নালের একটি সম্পর্কিত গবেষণায় (২০২৫ সালের অক্টোবর প্রকাশিত) দেখা গেছে যে, গাজায় ৩০ লাখেরও বেশি ‘লাইফ-ইয়ার্স’ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৮৬,০০০-এরও বেশি হতে পারে যদি পরোক্ষ মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পরিবর্তনটি গাজার জনগণের জন্য একটি ‘হিউম্যানিটেরিয়ান ক্যাটাস্ট্রফি’ তৈরি করেছে, যা শুধুমাত্র সামরিক নয় বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক ধ্বংসের প্রতিফলন।
এই গবেষণার প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যা যুদ্ধের বাস্তবতা নিয়ে বিতর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (পূর্বতন টুইটার) গবেষণাটি শেয়ার করে অনেকে এটিকে ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেমন জার্মান সাংবাদিক জেমস জ্যাকসন লিখেছেন যে এটি ‘১ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির হত্যাকাণ্ড’ নির্দেশ করে। অন্যদিকে, কিছু পোস্টে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন ‘হামাসের প্রচারণা’ বলে অভিযোগ, কিন্তু বেশিরভাগ রিয়্যাকশন এর বিশ্বাসযোগ্যতা স্বীকার করেছে কারণ এটি জার্মান সোর্স থেকে এবং জার্মান সরকারের ইসরায়েল-সমর্থন সত্ত্বেও প্রকাশিত। মিডিয়ায়ও এটি ব্যাপকভাবে কভারেজ পেয়েছে, যেমন আনাদোলু এজেন্সি এবং টিআরটি ওয়ার্ল্ডে, যা যুদ্ধের ‘ডার্ক ফিগার’ (অপ্রকাশিত সংখ্যা) তুলে ধরেছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায় যে, গবেষণাটি শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য একটি হাতিয়ার, যা যুদ্ধবিরতি এবং তদন্তের দাবি জোরদার করছে।
পতাকানিউজ/এনটি

