কক্সবাজারের পেকুয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে সরকারি নির্দেশনা নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে মাছ ব্যবসায়ীদের অপমান করার অভিযোগ উঠেছে এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে। ‘গা দিয়ে দুর্গন্ধ আসে’, ‘এসি রুমে লুঙ্গি পরে এসেছেন কেন’ এমন মন্তব্য করে ওই কর্মকর্তা মাছ ব্যবসায়ীদের অপমান করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপস্থিত ব্যবসায়ীরা।
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ মাছ ব্যবসায়ীরা অভিযুক্ত অফিস সহকারী নিতাই দাশের অপসারণ, বদলি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগামী ৮ অক্টোবর সাগরে মাছ ধরা ও মাছ আহরণসহ সরকারি বিধিনিষেধ ও নির্দেশনা নিয়ে আলোচনার জন্য ইউএনও রফিকুল ইসলামের কার্যালয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মৎস্য কর্মকর্তার ফোন পেয়ে মাছ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও মাছ বাজারের ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্টরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
বৈঠকে ইউএনও রফিকুল ইসলাম, মৎস্য কর্মকর্তা বুলবুল আকতার, মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী নৌ পুলিশের দুই কর্মকর্তা, বরফকলের মালিক জাহাঙ্গীর, শাহাব উদ্দিন, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি হারুনুর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৈঠক শুরুর প্রায় ১০ মিনিট পর ইউএনও’র অফিস সহকারী নিতাই হঠাৎ কক্ষে প্রবেশ করেন। প্রবেশ করেই তিনি মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এখানে দুর্গন্ধ আসছে কেন’, ‘তোমাদের গা দিয়ে গন্ধ আসছে’, ‘জানালা খুলে দাও’ এবং ‘এটি এসি রুম, লুঙ্গি পরে আসছ কেন’ এ ধরনের মন্তব্য করেন।
এতে উপস্থিত মাছ ব্যবসায়ীরা বিব্রত ও অপমানিত হন বলে দাবি করেন তারা।
ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, একপর্যায়ে ইউএনও নিতাইকে চুপ থাকতে বলেন। এরপরও তিনি বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকেন। এ সময় মৎস্যজীবী দলের সভাপতি হারুনুর রশিদ তাৎক্ষণিকভাবে নিতাইয়ের আচরণের প্রতিবাদ করেন।
বৈঠক শেষে পেকুয়া বাজার মাছ বিক্রয় ভবনের দ্বিতীয় তলায় ব্যবসায়ীদের কার্যালয়ে মাছ ব্যবসায়ীরা একত্রিত হন। সেখানে তারা অভিযুক্ত অফিস সহকারীর আচরণ ও মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান এবং তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।
মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, আমরা মৎস্য কর্মকর্তা ফোন করায় সরকারি নির্দেশনা শুনতে ইউএনও’র কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে সবার সামনে আমাদের উদ্দেশে মানহানিকর মন্তব্য করা হয়েছে। আমরা মাছ ব্যবসায়ী হতে পারি, কিন্তু আমরাও তো মানুষ। ২৪ ঘণ্টা মাছ নিয়ে কাজ করি বলে আমাদের শরীরে মাছের গন্ধ থাকতেই পারে। আমাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে এভাবে অপমান করা হবে, এটা আমরা কখনো আশা করিনি।
তারা আরও বলেন, লুঙ্গি পরে অফিসে যাওয়া যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের ডাকা হলো কেন? সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পান। একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে সাধারণ মানুষকে এভাবে অপমান করতে পারেন, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
মাছের দোকানের ইজারাদার আব্দুল মান্নান বলেন, মৎস্য কর্মকর্তা ফোন করে বৈঠক আছে বলে ইউএনও’র কার্যালয়ে যেতে বলেন। আমি কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিকে নিয়ে সেখানে যাই। বৈঠক চলাকালে অফিস সহকারী নিতাই রুমে ঢুকে দুর্গন্ধ, লুঙ্গি ও এসি রুম নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। ইউএনও তাকে চুপ থাকতে বললেও তিনি তা শোনেননি। আমাদের চরমভাবে অপমান করা হয়েছে। আমরা তার অপসারণসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি হারুন অর রশিদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অফিস সহকারী নিতাই দাশের এমন বিব্রতকর আচরণে মর্মাহত হলাম। এ ধরনের আচরণ করা তার ঠিক হয়নি। প্রতিবাদ করেছি। নিতাই দুর্গন্ধের কথা বললে উপস্থিত নৌ পুলিশ কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এখানে কোন দুর্গন্ধ পাচ্ছেন কি-না। তারা সবাই বললো এখানে দুর্গন্ধ নেই। কিন্তু নিতাই একবার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে আবার একজনকে দিয়ে জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরা যে মানুষ সে এটা কেয়ারও করেননি।
জানতে চাইলে বরফকলের মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সবার উপস্থিতিতে নিতাই দাশের এমন মন্তব্য খুবই মানহানিকর ও বিব্রতকর। এ ধরনের আচরণে আমরা চরম ক্ষুদ্ধ। মাছ ব্যবসায়ীরাও মানুষ।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অফিস সহকারী নিতাই দাশ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি। স্যারের রুমে ঢুকে দেখি গন্ধ। দরজা জানালা বন্ধ থাকায় গন্ধ লেগেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে এ ধরনের তেমন কিছুই হয়নি। নিতাইকে চুপ থাকতে বলি।’ এরপর জরুরি বৈঠক চলছে জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। উল্লেখ্য, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর সাগরে মাছ ধরা ও আহরণে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মাছ ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের সরকারি নির্দেশনা জানাতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

