গত জুলাই মাসে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষেরই দায় আছে বলে বিচার বিভাগীয় তদন্তে উঠে এসেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উসকানি, গুজব এবং উভয় পক্ষের অনমনীয় অবস্থানসহ মাঠের বাস্তবতা অনুযায়ী প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ রূপ দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—গোপালগঞ্জে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা থেকে, যা শেষ পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
তদন্ত কমিশনের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, এনসিপির সারাদেশব্যাপী কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে যখন ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ রাখা হয়, তখনই স্থানীয়দের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ‘এই নাম পরিবর্তন গোপালগঞ্জবাসীর কাছে উসকানির মতো মনে হয়েছে। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িতে হামলা, ওসির গাড়িতে বিস্ফোরণ—এসব ঘটনাই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রোগ্রামটি যেভাবেই হোক প্রতিহত করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল।’
কমিশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এনসিপির নেতৃত্বের জেদ ও গোপালগঞ্জবাসীর ‘গভীর আবেগমিশ্রিত রাজনৈতিক আনুগত্য’—এই দুইয়ের সংঘর্ষই সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সমাবেশের আগেই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এনসিপি শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি ভাঙতে পারে। পরে সমাবেশে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান উচ্চারিত হলে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।
সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, ‘গ্রামের সাধারণ মানুষ এই স্লোগানকে রাজনৈতিক মতের বিরোধ হিসেবে নয়, বরং শেখ মুজিবের প্রতি আক্রমণ হিসেবে নিয়েছিল। ফলে মসজিদ থেকে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে রাস্তায় নামানো হয়।’
তিনি জানান, ‘যখন ঘোষণা দেওয়া হয় যে এনসিপি স্থানীয়দের ওপর হামলা করেছে, তখন সবাই ‘যা আছে তাই নিয়ে বেরিয়ে আসুন’ আহ্বানে সাড়া দেয়। এর পরেই সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’
কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা তৈরি হলেও প্রশাসন আগেভাগে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল প্রকট।
তদন্ত কমিশন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওফুটেজ, ছবি, প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে। এতে দেখা যায়, সংঘর্ষে জড়িতদের অনেকেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল।
‘দলীয় নেতৃত্বেই স্থানীয় লোকজন একত্র হয়ে এনসিপি সমাবেশে হামলা চালায়,’ বলেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী।
সংঘর্ষের সময় এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সামরিক বাহিনী উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
কমিশনের সুপারিশ
প্রতিবেদনে ৮ থেকে ১০টি সুপারিশ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে পাঁচটি করণীয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- স্পর্শকাতর রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তত ১৫ দিন আগে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া।
- রাজনৈতিক বক্তব্যে শব্দ ও বাক্যচয়ন সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা।
- উসকানিমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
- বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির আগে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।
- মাঠপর্যায়ে অপারেশনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বডি ক্যামেরা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা।
এছাড়া গুলিতে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। কারা অধিদপ্তরের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ওই ঘটনায় গুলিতে ৫ জন নিহত হন। ৪ জনের মরদেহ পরবর্তীতে কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর কারণ ‘রক্তক্ষরণ ও শক’, যা ‘হত্যাকাণ্ডজনিত’ ছিল।
তবে কার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে তা কমিশনের কার্যপরিধির মধ্যে ছিল না। সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, ‘গুলির দায় নির্ধারণ একটি টেকনিক্যাল বিষয়। প্রয়োজনে ফরেনসিক বা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় আলাদা তদন্ত করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া টার্গেট করে গুলি চালানো আইনসঙ্গত নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লেথাল উইপন ব্যবহারে আরও সংযমী হতে হবে।’
কমিশনের প্রতিবেদন গত সেপ্টেম্বরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলেও এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সাজ্জাদ সিদ্দিকীর মতে, ‘এতে কোনো গোপনীয় তথ্য নেই। বরং সরকারের ট্রান্সপারেন্সি ও জনআস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি জনগণকে অবহিত করে, তাতে আস্থা বাড়বে। এটিই সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক হবে।’
গোপালগঞ্জের জুলাইয়ের সংঘর্ষের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে—রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও জনমানুষের ভুল ধারণার সমন্বয়ে এক ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম হয়। এই ঘটনার দায় কোনো একক পক্ষের নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের অসহিষ্ণু বাস্তবতার প্রতিফলন।
পতাকানিউজ/এনটি

