সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বরের রোগী। শিশু থেকে বয়স্ক সবাই আক্রান্ত জ্বরে। গত প্রায় আড়াই মাস ধরে চলছে এই পরিস্থিতি। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জায়। সাথে যোগ হয়েছে চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও করোনা সংক্রমণ। যা রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাকে জটিল করে তুলছে।
ঢাকার বাড্ডার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান জানান, গত ১০ দিন ধরে তার দুই ছেলে-মেয়ে এবং স্ত্রীর জ্বর ও তীব্র কাশি। গত সপ্তাহের শুরুতে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পর তার ছেলের জ্বর হয়। এর তিনদিন পর তার স্ত্রী এবং মেয়েরও জ্বর হয়। তাদের তিনজনেরই ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা করলেও তা নেগেটিভ এসেছে। জ্বর কমলেও শরীরে এখনো প্রচণ্ড ব্যথা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না।
ঢাকার মত একই চিত্র চট্টগ্রামেরও। চট্টগ্রাম নগরীর কর্নেল হাট এলাকার বাসিন্দা দুলাল মজুমদার নিজে জ্বরে আক্রান্ত তিনদিন ধরে। এরআগে গত সপ্তাহে তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে প্রিয়া মজুমদারের জ্বর হয়। দুলাল মজুমদার জানান, মেয়ের জ্বর কমেছিল। শুক্রবার থেকে আবার ১০৩ জ্বর। গায়ে র্যাশ আছে। আজ তাকে ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি ডাক্তার দেখাতে।
জরিপ বলছে, এই বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত যৌথ জরিপের ফলাফলে জুলাই মাসে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর নমুনায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
২০০৭ সাল থেকে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে ‘ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স ইন বাংলাদেশ (এনআইএসবি)’ এবং ‘হসপিটাল বেজড ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স ইন বাংলাদেশ (এইচবিআইএস)’ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর আওতায় সারাদেশের ১৯টি হাসপাতাল থেকে তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে।
এসব হাসপাতালের মধ্যে আছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কিশোরগঞ্জ জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নওগাঁ, ঠাকুরগাও, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট, যশোর ও গাজীপুর জেলা হাসপাতাল।
ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও করোনা ছড়িয়ে পড়ায় রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জটিল হয়ে পড়ছে
আইইডিসিআর এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাই মাসে ২৪৫৫ জন সম্ভাব্য রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে তাদের মধ্যে ১৪৫৩ জনের ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়। শতকরা হিসেবে যা ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ। এটি সার্ভে কার্যক্রমের শুরুর বছর থেকে সর্বোচ্চ শনাক্ত হার।বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম ধরা হয় এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। আইইডিসিআরের তথ্য অনুসারে, গত বছরের জুলাইয়ে এই হার ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এই হার ছিল ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
সম্প্রতি কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সতর্কতা জারি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে আইইডিসিআর। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্লু ভাইরাসের টিকা নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আইসিডিডিআর.বি এর রেসপিরেটরি ইনফেকশন্স প্রোগ্রামের সিনিয়র রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর তানজির আহমেদ শুভ বলেন, এবছরের জুলাই মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়া ছাড়াও বর্তমানে জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত যে অসুস্থতা দেখা যাচ্ছে তারমধ্যে বড় একটি অংশ ইনফ্লুয়েঞ্জা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা হলো ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ। মানুষের হাঁচি বা কাশির সময়ে এটি সহজে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগী দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর যাদের অন্য প্রাণঘাতি রোগ আছে তাদের জন্য এটি ঝুঁকির কারণ হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এবার মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য কোন ভাইরাসের কারণে জ্বর হচ্ছে কিনা সেটা জানতে হলে আক্রান্তদের তথ্য উপাত্তের রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন জানান, এখন পর্যন্ত সংস্থাটিতে যত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তার মধ্যে ৪৫ শতাংশই চিকনগুনিয়ার। অর্থাৎ এখন চিকনগুনিয়ার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি বাড়ছে চিকনগুনিয়া এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮,২০২ জন। মারা গেছেন ১১৪ জন। গত বছর একই সময় পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১০,৬৫৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৭৭ জনের। ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও করোনা ছড়িয়ে পড়ায় রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জটিল হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া সংক্রমণ কমানো সম্ভব না। ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য বিধি মানা জরুরি
ডা. মো. মামুনুর রশিদ
চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) এর ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশিদ জানান, ইনফ্লুয়েঞ্জা তো আছেই, পাশাপাশি চট্টগ্রামে এবার চিকনগুনিয়ার সংক্রমণ ডেঙ্গুর তুলনায় বেশি। ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়া উভয় রোগের বাহক এডিস মশা। চলতি বছর বর্ষায় কয়েকদিন পরপর টানা বৃষ্টি হয়েছে। আবার দুইবার বৃষ্টির বিরতিতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। যা এডিস মশার প্রজনেন জন্য উপযোগী। মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া সংক্রমণ কমানো সম্ভব না। ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য বিধি মানা জরুরি।
অক্টোবর থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রভাব কমতে পারে জানিয়ে আইইডিসিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে সতর্কতা হিসেবে ঘন ঘন সাবান পানি বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিতে হাত পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু বা বাহু দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখঅ, জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলে সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা ও জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে।
পাশাপাশি ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী; যারা দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগে ভুগছেন এবং গর্ভবতী নারীদের প্রতি বছর ফ্লু এর মৌসুম শুরুর আগে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
পতাকানিউজ/কেএস

