‘আয়নাবাজি’ সিনেমার কথা নিশ্চয় মনে আছে! জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এ সিনেমায় শরাফত করিম আয়না অন্য আসামির হয়ে অর্থের বিনিময়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে জেলে গিয়ে সাজা খাটতেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। এ কাজ করতে করতে তিনি একসময় ‘পেশাদার আসামি’ হয়ে উঠেন। আর এভাবেই সত্য-মিথ্যার খেলায় নিজেই জড়িয়ে পড়েন ভয়ঙ্কর এক ফাঁদে।
ঠিক ওই সিনেমার কাহিনীর মতোই চট্টগ্রামের আদালতে এক আসামির ‘আয়নাবাজি’ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি হলেন-সাইফুল ইসলাম সানি। যিনি কোতোয়ালী থানার চোরাই মোবাইল উদ্ধার মামলার অন্যতম আসামি। ওই মামলার শুনানিতে নিয়মিত উপস্থিতি দেখা গেছে তাকে। তার উপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এমনকি সরকারি নথিপত্রেও প্রমাণ মিলছে তার সশরীরে উপস্থিতির। কিন্তু পতাকানিউজের অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। তিনি নন, বরং তার হয়ে অন্য কেউ আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। যা আদালতের নজরে আনা হয়নি। এ ঘটনা আদালত পাড়ায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কী ঘটেছিলো সেদিন?
২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি নগরের আন্দরকিল্লার এক বিরিয়ানির দোকান থেকে চোরাই মোবাইল ফোন বিকিকিনির সময় দুজনকে হাতেনাতে আটক করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১২টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন নগর গোয়েন্দা বিভাগের এসআই অঞ্জন দাশগুপ্ত।

মামলায় আসামি করা হয়, পাথরঘাটা নজুমিয়া লেইন ৪নম্বর গলির মো. ইউসুফের ছেলে সাইফুল ইসলাম সানি (২৪) ও একই এলাকার আবু হেনা মো. আবছার উদ্দিনের ছেলে নাকিব মোস্তফা সানেমকে (২২)। গ্রেপ্তার হওয়ার ৫ দিন পর জামিনে মুক্তি পান সানেম আর ২৪ দিন পর মুক্তি পান সানি।
কোতোয়ালী থানার এসআই ইমাম হোসেন নগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় একই বছরের ৮ এপ্রিল অভিযোপত্র জমা দেন। সেই অভিযোগপত্রে দুজনকে আসামি করা হয়। ২ মে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। এ মামলায় ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর চার্জ গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চার্জ গঠনের পর ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের সময় নির্ধারণ করে আদালত। সেদিন সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। তবে আদালতে সেদিনের নথিপত্রে দুই আসামির সশরীরে উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। একইভাবে চলতি বছরের ২৩ মার্চ, ২৩ এপ্রিল, ১৮ জুন, ২৯ জুলাইসহ মোট ৫ দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুনানির সময় দুই আসামির আদালতে উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।

কিন্তু, পতাকানিউজ জানতে পেরেছে, এই পাঁচবারের একবারও আদালতে হাজির ছিলেন না সানি। তার হয়ে আদালতে হাজিরা দেন অন্য কেউ। সানি জামিনে মুক্তির কয়েক মাস পরই পাড়ি জমান প্রবাসে।
গতকাল রবিবার, ৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার আদালতে সেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল। তবে মামলার দুই আসামির কেউ সেদিন আদালতে উপস্থিত না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন করেন। এসময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন আদালতকে জানান, মামলার আসামি সাইফুল ইসলাম সানি দেশের বাইরে রয়েছেন। এ সময় সানির বিদেশ যাওয়ার একটি বিমানের টিকেট আদালতকে দেখান তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই আসামিকে পরবর্তী শুনানির সময় পাসপোর্টসহ সশরীরে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার অপর আসামি নাকিব মোস্তফা সানেম আগের তারিখগুলোতে নিজে আদালতে উপস্থিত থাকার কথা পতাকানিউজকে নিশ্চিত করেছেন।
সাইফুল ইসলাম সানি কোথায়?
সাইফুল ইসলাম সানি আদালতে অনুপস্থিত কেন, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ কতটো সত্য- এ তথ্যের খোঁজ করতে গিয়ে পতাকানিউজ জানতে পেরেছে, সানি বর্তমানে সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে বসবাস করছেন। তার পাসপোর্ট, সৌদি আরবের ভিসা ও বাংলাদেশ থেকে বিমানে সৌদি আরব যাওয়ার একটি টিকেট পতাকানিউজের হাতে এসেছে।
টিকেটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২ আগস্ট রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ওমান এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে মস্কট যান তিনি। সেখান থেকে রাত পৌনে ২টায় অপর একটি ওমান এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে সৌদি আরবের রিয়াদে অবতরণ করেন। এরপর সানি আর দেশে ফিরেননি।
সেই বিমান টিকেটের সত্যতা নিশ্চিতে রবিবার, ৩১ আগস্ট বিকেল ৩টায় সানির ঠিকানা পাথরঘাটার নজুমিয়া লেইন ৪ নম্বর গলিতে যান পতাকা সারথি। এসময় তার ছোট ভাই তাহসিন আহমেদ সোহামের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জানান, সানি ২০২৩ সালের আগস্টে সানি সৌদি আরব গেছে। এখনও দেশে ফিরেনি। সোহাম এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানান।
যদি আসামির পরিবর্তে অন্য কেউ প্রক্সি দেয়ার সময় ধরা পড়ে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে
মফিজুল হক ভূঁইয়া, পিপি
এদিকে সানি তার ফেসবুকে (Sunny) চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি একটি ছবি আপলোড করেন। এতে দেখা যায়, তিনি মোবাইল ফোনে ব্যস্ত রয়েছেন। তার টেবিলে দুটি ওয়ানটাইম কাপ আছে। এতে লেখা KUDU। এটি সৌদি আরবের একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট। যেটির শাখা পুরো সৌদি আরব জুড়ে রয়েছে।
কী বলছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী
২০২৩ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম ছেড়ে যান সানি। তাহলে গত ২ বছরে তার হয়ে আদালতে হাজিরা দিলেন কে? সানির আইনজীবী উৎপল দাশ তাহলে কার হয়ে আদালতে লড়লেন? জানতে চাই উৎপল দাশের কাছেই। তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে আদালতে উপস্থাপিত বিমানের টিকেটটি ভুয়া বলে দাবি করেন। উৎপল দাশ বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন ছাড়াই মৌখিকভাবে আদালতকে একটি বিমানের টিকেট দেখিয়েছেন। কোনো পিটিশন দেননি। টিকেটটি আমি যাচাই করে দেখবো।’

আইনজীবী উৎপল দাশের সীলমোহরসহ আদালতে আসামি উপস্থিতির তথ্য পতাকানিউজের কাছে রয়েছে। সেদিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল কিনা জানতে চাইলে আসামি পক্ষের আইনজীবী উৎপল দাশ জানান, সাক্ষী হাজির না হলে আসামির হাজিরা অটো হয়ে যায়।
আদালতের সঙ্গে এ ধরণের প্রতারণা বিষয়ে জানতে চাই সিনিয়র আইনজীবী মফিজুল হক ভূঁইয়ার কাছে, তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর পিপির দায়িত্ব পালন করছেন। মফিজুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘যদি আসামির পরিবর্তে অন্য কেউ প্রক্সি দেয়ার সময় ধরা পড়ে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে। আসামি যদি বিদেশ থাকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে।’
সাক্ষী হাজির না হলে আসামির হাজিরা অটো হয়ে যায়
উৎপল দাশ
আসামিপক্ষের আইনজীবী
তিনি বলেন, ‘আইনজীবী চাইলে আসামির অনুপস্থিতিতে হাজিরা দেখাতে পারবে। এর জন্য আগে আদালতে প্রার্থনা করতে হবে। আদালত অনুমতি দিলে আসামির অনুপস্থিতিতে আইনজীবী হাজিরা দেখাতে পারবে। আর যদি আইনজীবী এ ধরণের প্রার্থনা না করেন তবে তিনি ফ্রট বলে গণ্য হবে বলে জানান পিপি।’
কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এলো সাপ
আসামিপক্ষের আইনজীবী নিশ্চয় এসব তথ্য জানেন। তাহলে কেন তিনি এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিলেন? জানতে গিয়ে যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এলো। পাথরঘাটায় যে বাড়িতে সানি থাকেন, সেটি তাদের নিজস্ব ভবন। সানির বাবার নামে ওই ভবনের নাম ইউসুফ ভিলা। এ ভবনেরই ৪র্থ তলায় ভাড়ায় থাকেন আইনজীবী উৎপল দাশ। দুই বছর আগে সানির দেশ ছেড়ে যাওয়ার তথ্যও নিশ্চয় উৎপল দাশের জানা আছে। তাহলে তিনি আদালতে আসামি অনুপস্থিতির আবেদন করলেন না কেন- এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
সানির বদলে আদালতে কে প্রক্সি দেন -এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উৎপল দাশ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। আদালত এ মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এমন ঘটনাকে রীতিমতো সিনেমাটিক বলে আখ্যায়িত করছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা। অনেকে বলছেন, ‘আয়নাবাজি’ শুধু পর্দায় নয়, আদালতের ভেতরেও হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, আদালতে কিভাবে এমন প্রতারণা সম্ভব হলো?
বাদী পক্ষের আইনজীবী মো. শাহজাহান বলেন, ‘আসামি সানি দেশে নেই। তার একটি বিমানের টিকেট আমার কাছে ছিল। সেটি আদালতে উপস্থাপন করেছি। আসামির অনুপস্থিতিতে আদালতে কে হাজিরা দিতেন সে বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন।’
পতাকানিউজ/আরবি/কেএস

