চট্টগ্রামের মানুষ আসলে খুব আবেগী। তারা শহর, পাহাড়, কর্ণফুলী ও হালদা নদী এবং বঙ্গোপসাগরকে ভালোবাসে। তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে -বৃষ্টিকে। কারণ বৃষ্টি সবসময়ই এই শহরের বাসিন্দাদের নতুন ‘আত্মপরিচয়’ দেয়।
অনেক শহরে বৃষ্টি মানে রোমান্টিক গান, কফির কাপ আর বারান্দা কিংবা খোলা জানালা।
আর চট্টগ্রামে? এই শহরে বৃষ্টি মানে স্কুল কিংবা অফিসমুখী হওয়ার আগে পারিবারিক বৈঠক। আজ কোন সড়ক ধরে যাওয়া নিরাপদ? কোথায় হাঁটু? কোথায় কোমর? কোথায় বুক? আর কোথায় সরাসরি সাঁতার?
পাঠক, ভাবছেন জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের সমস্যা। আসলে বিষয়টি মোটেই তেমন না। -এটা এই শহরের বাসিন্দাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রণয়ের সম্পর্ক। প্রায় তিন দশকের প্রণয়। এই সম্পর্ক ছিন্ন করতে গত তিন দশকে পাঁচজন মেয়র এবং একজন সিডিএ’র চেয়ারম্যান নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁরা এসেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার খালি করে অর্থ শ্রাদ্ধ করেছেন। কিন্তু জলাবদ্ধতার সঙ্গে মহানগরবাসীর সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেননি। তাই আজো সম্পর্ক টিকে আছে।
কারণ নগরবাসীর সঙ্গে জলাবদ্ধতার প্রণয় চলছে। আচ্ছা, প্রেম-প্রণয় কী চাইলেও শেষ করা যায়? শহর জলাবদ্ধতার পানি ছাড়া থাকতে পারে না। আবার জলাবদ্ধতাও শহর ছাড়া থাকতে চায় না।
২০১০ সালের দিকে এই মহানগরীর বাসিন্দাদের খুব রাগ হয়েছিল। সেবার নগরপিতা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। তিনি নাগরিকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে জলাবদ্ধতাকে দূর করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু ঠিকঠাক মতো দূর করতে পারেননি। বাহ্, নাগরিকদের কি রাগ?
তারপর নাগরিক ভোটাররা মিলে জনাব চৌধুরীকে মেয়র পদ থেকেই সরিয়ে দিলেন? আচ্ছা, বলুন- এমন কাণ্ড কেউ করে? প্রেয়সী তাড়াতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে কি মেয়র পদ কেড়ে নিতে হয়?

প্রণয় ভাঙতে চাওয়া নাগরিকেরা এবার নতুন মেয়রকে দায়িত্ব দিলেন। এলেন বিএনপির এম মনজুর আলম।
নতুন মেয়র এসে বললেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর করবো।’ পরিকল্পনা হলো, প্রকল্প হলো, কাজ হলো। মেয়র জলাবদ্ধতা তাড়ানোর নামে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে অর্থকড়ি কম শ্রাদ্ধ করেননি। অর্থ গেলেও মেয়র খুশি।
এবার জলাবদ্ধতার পানি একটু নার্ভাস। কিন্তু কিছুদিন পর ভর বর্ষায় পানি বুঝল -ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শহর তাকে সরাতে চায় না, বরং তাকে আরও উন্নত পরিবেশ দিচ্ছে।
জল তো জলই। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থও গেল জলে। মানে, জলের পেটে!
মনজুর আলমের কাণ্ড কারখানা দেখে চট্টগ্রামবাসী নতুন আশার ভেলা বাঁধলেন। আবারো আনলেন নতুন মেয়র। এবার আওয়ামী লীগের আ জ ম নাছির উদ্দীন এলেন দৃশ্যপটে।
নতুন মেয়র। নতুন উদ্যম। নতুন পরিকল্পনা। নতুন প্রতিশ্রুতি। শহর আবার আশাবাদী।
সব দেখে পানি আবারও হাসল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘জলে ভাসলেন’ নাছির।
এরপর এলেন আওয়ামী লীগের রেজাউল করিম।
এবার তো পানির অবস্থা আরো রমরমা। বহদ্দারহাট এলাকায় মেয়র সাহেবের বাসা ধুঁয়েমুছে পরিষ্কার করে দিল পানি। বাহ্, চমৎকার ব্যবস্থা বটে। যেন অটো পদ্ধতি।

পানি গণতান্ত্রিক। সে বৈষম্যে বিশ্বাস করে না। ভিআইপি এলাকা বাদ দিলে তার ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। তাই মেয়র সাহেবের বাড়ি ডুবিয়েছে। মূলত, পানি বলতে চাইল, ‘আমি বৈষম্য করি না। আমি গণতান্ত্রিক। আমি সবার জন্য সমান।’
পানির এমন পদোন্নতি দেখে ঈর্ষা হলো সিডিএ চেয়ারম্যানের। নগর কর্তৃপক্ষ চিন্তা করলো, ‘… তো দীর্ঘদিন মরুদ্যান। এবার বড়সড়ো একটা প্রকল্প নিই।’ দেশ পরিচালকের অনুমোদন নিয়ে একেবারে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলো।
খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ, উন্নয়ন। বাহারি সব শব্দ শহরের বাতাসে ভাসতে লাগল। যা দেখে আবেগে ভেসে গেল পানি।
পানি ভাবল, ‘আমাকে এত গুরুত্ব! এত বাজেট! এত আলোচনা! আমি তো ভিআইপি।’
তারপর পানি দেখাল -চট্টগ্রামে এক ঘণ্টা বৃষ্টি মানেই পানি পুরো শহর কভার করতে পারে। এত দ্রুত সার্ভিস কুরিয়ার কোম্পানিও দেয় না। পানির ভাবখানা এমন যে মনে মনে বলে, ‘এই শহর আমাকে সরাতে চায় না, এরা আপগ্রেড করছে।’
আগে বৃষ্টি হলে পানি হাঁটু পর্যন্ত উঠত। এখন বুক পর্যন্ত ওঠে। মাঝে মাঝে মাথাও ছাড়িয়ে যায়। এটা কি উন্নয়ন নয়?
চট্টগ্রামে সবচেয়ে নিশ্চিত ক্যারিয়ার গ্রোথ যদি কারও হয় -সেটা পানির। এই শহরের মানুষ ঠিকমতো চাকরি পায় না, পদোন্নতি পায় না, কিন্তু পানির পদোন্নতি ঠিকঠাক।
এরপর আদালতের নির্দেশে নতুন নগর পিতা হলেন ডা. শাহাদাত হোসেন। বললেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর হবে।’
পানি আবার মনোযোগ দিয়ে শুনল। সে খুব ভদ্র। সব মেয়রের কথা মন দিয়ে শোনে। তারপর পানি আবার চুপচাপ বসে আছে। সে জানে- ইতিহাস পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে। এখন চট্টগ্রামের জীবনধারা বদলে গেছে। মা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর আগে জিজ্ঞেস করেন,
‘ছাতা নিয়েছো?’ সন্তান বলে, ‘না মা, লাইফ জ্যাকেট দাও।’
রিকশা এখন শুধু বাহন না -অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস।
রাস্তা পার হওয়া মানে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট।
আর ড্রেন মানে – লুকায়িত ইতিহাস।

ফলে এখন বর্ষায় চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা খুব বাস্তবমুখী শিক্ষা পায়।
ফিজিক্স: ভাসমানতা
জিওগ্রাফি: খাল ছিল কোথায়?
লাইফ স্কিল: ড্রেন এড়িয়ে চলা
ওহ, হ্যা। আরেকটি বিষয়। এই শহরের মানুষ বৃষ্টি দেখলে কবিতা লেখে না। তারা ফোন চার্জ দেয়। কারণ পানি এলে বিদ্যুৎ যায় -কিন্তু পানি যায় না।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে স্থায়ী জিনিস হলো -অনিশ্চয়তা নয়, বরং নিশ্চয়তা। বৃষ্টি হলে পানি আসবেই। এটা এমন এক নির্ভরযোগ্য সিস্টেম, যা অব্যর্থ।

অনেকে বলে – জলাবদ্ধতা সমস্যা কেন সমাধান হয় না? আসলে আমরা ভুলভাবে ভাবছি। সমস্যা সমাধান হয়নি -এই ধারণাই ভুল। জলাবদ্ধতা এত বছর ধরে টিকে আছে -এটাও তো এক ধরনের সফলতা!
জলাবদ্ধতা সমস্যা তিন দশক ধরে টিকে আছে -এটা কি চাট্টিখানি কথা?
সববুঝে নির্বাক নগরবাসী হাসে। কারণ না হাসলে কাঁদতে হবে। আর কাঁদলেও পানি বাড়বে। মহানগরীতে নাকি ৬০-৭০ লাখ মানুষের বসতি। এক সঙ্গে যদি প্রায় দেড় কোটি চোখের পানি নগরীর নালায় পড়ে? তাহলে ভাবুন, কি পরিমাণ পানি প্রবাহিত হতে পারে এই ‘ওয়াটার পার্কে’। তাই অন্তত -হাসা নিরাপদ।
তারা হাসতে হাসতে বলে, ‘আহারে… এই শহরটা কত সুন্দর।’ তারপর আকাশে মেঘ দেখে। এরপর চুপি চুপি বলে, ‘… আবার আসছে।’
-পতাকানিউজ

