চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন ট্যারিফ শিডিউলে পণ্যবাহী গাড়ির গেট পাসের বর্ধিত ফি স্থগিত করা হয়েছে। রবিবার, ১৯ অক্টোবর বিকেলে পরিবহন শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান।
এর আগে বন্দরে নতুন ট্যারিফ ফি ধার্য করা হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে ‘চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ গত ১৫ অক্টোবর থেকে কন্টেইনার পরিবহন স্থগিত রাখে। এতে পণ্য উঠানামা ও পরিবহনে তৈরি হয় অচলাবস্থা।
বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্ধিত ফি প্রত্যাহার করতে এবং গেট পাসের জন্য আগের হারেই চার্জ অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। আমাদের দাবি পূরণ হওয়ায়, আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছি।’
বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দর চেয়ারম্যান মহোদয়ের সভাপতিত্বে শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে। সরকারি অনুমোদনক্রমে জারি করা এ গেজেট বন্দর প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে কোনোরকম কারেকশন কিংবা বন্ধ করতে পারে না। তারপরও পরিবহন শ্রমিকদের বিষয়টা বিবেচনা করে, যেহেতু এ বিষয়টির সঙ্গে দেশের আমদানি রপ্তানি জড়িত তাই এ কার্যক্রম দ্রুত চালু হওয়া উচিত তাই চেয়ারম্যান মহোদয়সহ বন্দরের সদস্যরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত শুধু যানবাহন খাতে যে ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে সেটা স্থগিত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চবক বোর্ডে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবো। প্রস্তাব অনুমোদন হয়ে আসলে আপনারা জানতে পারবেন কী সিদ্ধান্ত হয়েছে। আপাতত তা স্থগিত থাকবে। উপস্থিত শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিরা আশ্বস্ত করেছেন তারা কাজে ফিরে যাবেন। বাইরে প্রায় ৬ হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান অপেক্ষা করছে। সব বন্দরে ডেলিভারি বা রপ্তানি কাজে নিয়োজিত হবে।’
সরকারি সিদ্ধান্তের জন্য সুপারিশ পাঠানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চিঠি দেয়ার দাপ্তরিক কার্যক্রম রয়েছে। সভার কার্যবিবরণী হয়ত সংশ্লিষ্টরা পেতে পারেন। পুরো এখতিয়ার সরকারের। যেহেতু ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে বন্দরের ডেলিভারি, আমদানি রপ্তানি সরাসরি সংশ্লিষ্ট তাই সরকারি সিদ্ধান্তের জন্য সুপারিশ পাঠানো হবে। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি, প্রাইম মুভার নিয়ে সভা হয়েছে।’
বন্দরের নতুন ট্যারিফ শিডিউল স্থগিতের দাবিতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কর্মচারীদের কর্মবিরতি এবং পোর্ট ইউজার ফোরামের হুঁশিয়ারির বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
এর আগে পণ্যবাহী গাড়ির গেট পাস ফি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় অচলাবস্থা। বন্দরের প্রবেশ ফি ৫৭ টাকা থেকে এক লাফে ২৩০ টাকা নির্ধারণ করায় প্রাইম মুভার ও ট্রেইলার মালিকরা গত ১৪ অক্টোবর রাত থেকে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখেন। এর ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ও ফ্লাটবেড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ‘এটি কোনো ধর্মঘট নয়, বরং অন্যায্য ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। গেট পাস ফি ৫৭ টাকা থেকে এক ঝটকায় ২৩০ টাকা করা হয়েছে। এটি অযৌক্তিক। বন্দরের সঙ্গে আলোচনার পর মালিকরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’
ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও চার ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন রবিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের এ কর্মবিরতি ছিল সতর্কতা মূলক। সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানাতে চেয়েছি, এই সিদ্ধান্তে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।’
এদিকে আন্তঃজেলা ট্রাক মালিক সমিতিও একই দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ফলে আন্দোলনের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থায় ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত সমাধান না এলে রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
বন্দর ব্যবহারকারীদের সংগঠন পোর্ট ইউজার্স ফোরাম শনিবার নেভি কনভেনশন হলে এক প্রতিবাদ সভা করে। সেখানে সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী হুঁশিয়ারি দেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে ট্যারিফ সমস্যা সমাধান না হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হব।’
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য হ্যান্ডল করে। সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসায়ী মহলের আশা, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আসবে।
পতাকানিউজ/আরএস/আরবি

