চট্টগ্রামের ঐতিহ্য আবদুল জব্বারের বলীখেলা ঘিরে আজ, শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে দুদিনের বৈশাখী মেলা। পরদিন ২৫ এপ্রিল, শনিবার বিকেল ৩টায় মহানগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বলীখেলার ১১৭তম আসর। প্রতিবছর ১০০ থেকে ১৫০ জন এ খেলায় অংশ নেয়।
তবে প্রতিবছর মেলা ৩ দিন হলেও এবার এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২৬ এপ্রিল, রবিবার ভোরের মধ্যে শেষ হবে মেলা।
এদিকে বুধবার, ২২ এপ্রিল সকালে নগরীর লালদীঘি চত্বরে বলীখেলার প্রতিকৃতি–সংবলিত ম্যুরালের উদ্বোধন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। চত্বরটির নাম এ বলীখেলার প্রবর্তক আবদুল জব্বারের নামানুসারে ‘জব্বার চত্বর’ নামকরণ করা হয়েছে।

অপরদিকে বলীখেলার জন্য লালদীঘি মাঠে চলছে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের মঞ্চ তৈরির কাজ। ব্যস্ত সময় পার করছেন মঞ্চ তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা। পাশাপাশি কাজ তদারকি করছেন আয়োজকরাও।
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল বিকেলে নগরীর লালদীঘি মাঠ ঘুরে দেখা গেল এমন চিত্র।
সরেজমিন দেখা যায়, লালদীঘি মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। কেউ মাটি খুঁড়ছেন, কেউ খুঁড়ে রাখা গর্তে ঢুকাচ্ছেন বাঁশ, আবার কেউ বাঁশে বাঁধছেন দড়ি। আর এসব কাজ তদারকি করছেন আয়োজকদের কয়েকজন।
শ্রমিকরা জানান, বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে মঞ্চ তৈরির কাজ। মঞ্চের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট ও প্রস্থ ২০ ফুট। বলীখেলার আগের দিন অর্থাৎ শুক্রবার তের মধ্যে শেষ হবে কাজ।
আয়োজকরা জানান, বলীখেলার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। মঞ্চ তৈরির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে পসরা নিয়ে আসছেন মেলায় অংশগ্রহণকারীরা। শুক্রবার সকাল থেকে মেলা শুরু। শনিবার সকাল থেকে বলীখেলায় অংশগ্রহণকারীদের নাম লিপিবদ্ধ করা হবে।
এ বিষয়ে আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটির আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান পতাকানিউজকে বলেন, ‘আগামী ২৫ এপ্রিল বিকেল ৩টায় বলীখেলার ১১৭তম আসর লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। শুক্রবার থেকে শুরু হবে দুদিনের বৈশাখী মেলা। এবার এসএসসি পরীক্ষার কারণে একদিন মেলা কমানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বলীখেলার উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। স্পন্সর হিসেবে রয়েছে বাংলালিংক।’

মেলা কমিটির সদস্য সচিব ও মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগরের নাতি শওকত আনোয়ার বাদল পতাকানিউজকে বলেন, ‘বলীখেলায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে বলীরা যোগাযোগ শুরু করেছে। খেলার একদিন আগে নাম অন্তুর্ভুক্ত করা হবে। প্রতিবছর খেলায় অংশ নেয় শত বলী। এছাড়া বৈশাখী মেলায় অংশ নিতে বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে এসেছেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ীরা।’
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, বলীখেলায় পাঁচটি ধাপে প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। প্রথম বাছাইয়ের পরের রাউন্ড পর্বে ৫০ জনকে নিয়ে খেলা হয়। সেখান থেকে ২৫ জন যান মূল চ্যাম্পিয়ন পর্বে। এখানে কোনো পয়েন্ট ব্যবস্থা নেই। কুস্তি করতে করতে মাটিতে যার পিঠ যে লাগাতে পারবে সেই বিজয়ী হবে। প্রতিবছর ১০০ থেকে ১৫০ জন বলী দূর-দূরান্ত থেকে এসে খেলায় অংশ নেয়।
আয়োজকরা জানান, ১০৩ বছর আগে ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা আবদুল জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ নগরের লালদীঘি মাঠে এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশ নেওয়াদের বলা হয় ‘বলী’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘কুস্তি’ বলীখেলা নামে পরিচিতি।
বাঙালি সংস্কৃতি এবং একইসঙ্গে বাঙালি যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই আবদুল জব্বার সওদাগর এ বলিখেলার প্রবর্তন করেছিলেন। ব্যতিক্রমধর্মী এ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার সওদাগরকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামিদামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন।
এদিকে বলীখেলাকে ঘিরে নগরের আন্দরকিল্লা, বক্সিরহাট, লালদীঘি পাড়, কেসিদে রোড, সিনেমা প্যালেস, শহীদ মিনার সড়ক, কোতোয়ালী মোড়, জেল রোডসহ প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে বসেছে বৈশাখী মেলা। বিভিন্ন জেলা থেকে বাহারি পসরা নিয়ে মেলায় এসেছেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ীরা।
অপরদিকে জব্বারের বলীখেলা ও মেলাকে ঘিরে নগরজুড়ে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। নগরবাসীর মনে দেখা দেয় বাড়তি আনন্দ। দূর-দূরান্ত থেকে বলিখেলা দেখতে ও মেলায় ঘুরতে আসে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। বৈশাখের তীব্র গরম ও ভিড় উপেক্ষা করে সবাই ঘুরে বেড়ান মেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। তবে নারীরা ঐতিহ্যের বলীখেলা উপভোগ করা থেকে প্রতিবছরই বঞ্চিত হন। কারণ তাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করে না আয়োজক কমিটি।
পতাকানিউজ/আরবি

