চট্টগ্রাম মহানগরের বাকলিয়া থানার এক্সেস রোডে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ব্যানার লাগানো নিয়ে কলেজছাত্র ও আনসার সদস্য সাজ্জাদ হত্যাকাণ্ড রাজনীতির ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট ও মামলাকে ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। নিহতের মা ফরিদা বেগমের দায়ের করা দ্বিতীয় মামলায় উঠে এসেছে পরিকল্পিত ‘ব্ল্যাকআউট’, রাজনৈতিক যোগাযোগ, মামলায় প্রভাব খাটানো এবং হত্যার পর ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগ।
২৫ মিনিটের ব্ল্যাকআউট : সাজ্জাদ হত্যার অজানা স্ক্রিপ্ট
স্থানীয়দের দাবি, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিট থেকে ১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত এক্সেস রোড–সৈয়দ শাহ রোড–বলাকা আবাসিক এলাকা পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। ওই সময়ের মধ্যেই এমদাদুল হক বাদশার অনুসারীরা অবস্থান নেয় এমন অভিযোগ রয়েছে মামলায়।
দ্বিতীয় মামলার ৫ নম্বর সাক্ষী প্রকৌশলী রিয়াজুল হক জানান, বিদ্যুৎ লাইন বন্ধের কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল না। তার মতে, বিষয়টি ইচ্ছাকৃত না হলেও ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্ন উঠেছে অন্ধকারকে কি অপরাধ চাপানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হলো?
নিহত সাজ্জাদকে আল আমিন ফোনে ডাকে, যদিও পরিবারকে সে জানিয়েছিল মোবারক ডাকছে। রাত ১টা ২৪ মিনিটে আসামি আবদুল কাদের সাজ্জাদের মাকে ফোন করে হাসপাতালে যেতে বলেন। তবে হাসপাতালের নথিতে দেখা যায়, সাজ্জাদের নিথর দেহ পৌঁছায় ১টা ৪১ মিনিটে। প্রশ্ন উঠছে লাশ পৌঁছানোর আগেই কাদের কীভাবে জানলেন সাজ্জাদ হাসপাতালে?
বাদশার ছায়া, মায়ের মামলা—তদন্তে নতুন পথরেখা
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাদশা গ্রুপ আগেই এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল, দোকানপাট বন্ধ করানো হয়েছিল, রাস্তাও ছিল ফাঁকা। অন্ধকারে গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে বলাকা আবাসিকের সামনে সাজ্জাদের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
অন্যদিকে বাদশা গ্রুপ দাবি করে, তাদের ওপর প্রতিপক্ষ হামলা করেছিল এবং তারা আহতদের উদ্ধার করছিল। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে আহতদের হাসপাতালে নেয়া এবং একই সময়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। সবকিছু কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল?

প্রথম মামলাটি করেন সাজ্জাদের বাবা। অভিযোগ উঠেছে চাপ, ভয়ভীতি ও বিভ্রান্তির মধ্যে তাকে ‘অন্য পক্ষকে’ আসামি করার জন্য ব্যবহার করা হয়। সেই মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হয়, কিন্তু বাদশা ও তার ঘনিষ্ঠদের নাম বাদ পড়ে। পরে পুলিশও দ্রুত গ্রেপ্তার করে ১০ জনকে। এই কারণে প্রথম মামলাটি ‘সাজানো’ হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
দ্বিতীয় মামলার অভিযোগে নিহত সাজ্জাদের মা ফরিদা বেগম জানান, বাদশা ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে ‘ব্ল্যাকআউট অপারেশন’ চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটান এবং পরে মামলা ভিন্ন খাতে নিতে ষড়যন্ত্র করেন। মামলায় বাদশার ভাই জাবেদ, সাদ্দাম, জাকির, জসিম, ফয়সালসহ একাধিকজনের নাম এসেছে। তার অভিযোগ, বাদশা এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে অস্ত্রধারী বাহিনী দিয়ে নিয়মিত ভয়ভীতি দেখাতেন।
মামলা প্রত্যাহার চাপ, অস্ত্র–মহড়া ও রাজনৈতিক দাপট
দ্বিতীয় মামলা দায়েরের পর ফরিদা বেগম অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নিজে তাকে ফোন করে মামলা প্রত্যাহার করতে বলেন। এছাড়া তার বাসার সামনে অস্ত্রধারীদের ‘মহড়া’ দেয়ার ঘটনাও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে। হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দেন। তিনি দাবি করেন, মামলা দায়েরের পরদিন থেকেই নতুন করে চাপ বাড়তে থাকে।
মোজাম্মেলের স্বীকারোক্তি, জসিম–হিরনের ফোনালাপ, বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়ার সময়সূচির অসঙ্গতি, এবং সাজ্জাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজনের আচরণ সব মিলিয়ে দ্বিতীয় মামলাটি তদন্তকে নতুন দিকে নিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, হত্যার পর বাদশা গ্রুপের দ্রুত লাশ নেয়া, জানাজা আয়োজন, মানববন্ধনে সক্রিয়তা এসবই ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার ইঙ্গিত দেয়।
যুবলীগ–ছাত্রদল–শিবির পরিচয়ে বিভ্রান্তি
হত্যার পর ভোরে সিটি মেয়র হাসপাতালে গিয়ে সাজ্জাদকে দেখেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের’ বিষয়ে তিনি ওসিকে এবং সিএমপি কমিশনারকে ফোন করেছিলেন। এই বক্তব্য জনমনে নতুন প্রশ্ন তোলে তিনি কি আগে থেকেই ঘটনার বিষয়ে জানতেন? এছাড়া যাদের তিনি যুবলীগের সন্ত্রাসী হিসাবে উল্লেখ করেছেন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
বোরহান উদ্দিন ২০১৫ সালের নগর ছাত্রদল কমিটির সাহিত্য সম্পাদক (চকবাজার থানা)। নজরুল ইসলাম সোহেল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (পটিয়া)। মিল্টন সাবেক ছাত্রশিবির কর্মী।

এ তথ্য প্রকাশের পর স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে মেয়র কেন তাদের নিজেদের দলের কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন? আরও জানা গেছে, বাদশা ও বোরহানের মধ্যে গত ৭–৮ মাস ধরে নিয়মিত ফোনালাপ ছিল। তাদের একসঙ্গে মিছিলে থাকা ও একে অন্যকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ভিডিও–ছবিও পাওয়া গেছে।
যুবদল থাকে না দায় নিতে—তবু কেন এত তৎপরতা?
বাদশা দীর্ঘদিন নগর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দখল ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশে ১২ জুলাই ২০২৫ তাকে যুবদলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তার অপকর্মের দায় দল নেবে না এবং ভবিষ্যতে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
চট্টগ্রাম ৫ম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বিচারক নুসরাত জাহান জিনিয়ার আদালতে মামলাটি এখন আদেশের অপেক্ষায়। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়। ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব, একটি মায়ের ন্যায়বিচারের আকুতি এবং সত্য আড়াল করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই।
অভিযোগের বিষয়ে জানাতে এমদাদুল হক বাদশার সঙ্গে ফোন কলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
পতাকানিউজ/ কেএস

