চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে শিশুদের ভর্তি সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৯ মার্চ হাসপাতালে ১২ শিশু ভর্তি হয়েছিল, আর আজ সোমবারও কয়েকজন শিশু নতুনভাবে ভর্তি হয়েছে।
শিশুদের মধ্যে জ্বর, কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, আক্রান্ত অনেক শিশু মায়ের কোলে কিংবা বিছানায় আছে। একটি বিছানায় তিনজন শিশুকে রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত শিশু রোগী ভর্তির কারণে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ সব শিশু রোগীকে বেড দিতে পারছে না। স্থান সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতেও অনেক শিশুরোগীকে রাখা হয়েছে। মায়েরা সন্তানদের আগলে রাখলেও রোগ-জীবাণু থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা কঠিন। এমতাবস্থায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
শিশুদের আলাদা পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা
হাসপাতালে শিশু রোগীদের শিশু ওয়ার্ডের পৃথক একটি কর্নারে রাখা হয়েছে। এতে নতুন ভর্তি হওয়া শিশুদের অন্য রোগীর সঙ্গে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো হচ্ছে। অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৫ মাসের কম এবং তারা কক্সবাজার অঞ্চল থেকে এসেছে। ভর্তি ১২ শিশুর মধ্যে ২ জন ৬ মাসের কম বয়সী, বাকিদের বয়স ৭ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মুছা মিঞা বলেন, ‘সাধারণত হামের লক্ষণ দেখেই প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করা হয়। তবে নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা করতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিকভাবে যাদের শনাক্ত করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরে হাম ধরা পড়ে।’ তিনি আরও জানান, যদিও হামের জন্য আলাদা সুবিধা নেই, তবে রোগীদের আলাদা স্থানে রাখা হচ্ছে যাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
হাম কী ও প্রতিরোধ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া, এবং পরবর্তীতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই প্রধান প্রতিরোধের উপায়।
দাতা সংস্থাগুলোর এক সূত্র জানায়, এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়েছিল। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়, তবে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমের কারণে এর প্রকোপ কমে এসেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অনেক শিশু নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে হাম ও রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমও অনেক এলাকায় অনিয়মিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সতর্কতা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে ভর্তি হওয়া সব শিশু হাম আক্রান্ত, তবে আমরা রোগীদের আলাদা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করছেন।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ রোধ করতে সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা, শিশুদের মধ্যে জনসমাগম কমানো, এবং আক্রান্তদের দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পাশাপাশি স্থানীয় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
চট্টগ্রামে শিশু ভর্তি বৃদ্ধি দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজারসহ আশপাশের অঞ্চলে জনসচেতনতা ও টিকা কার্যক্রমকে আরও ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দেশে হাম সংক্রমণের বিস্তার ও উদ্বেগ
দেশে হাম সংক্রমণ আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অন্তত সাতটি জেলায় – ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে সংক্রমণ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি ও রোগ নজরদারির দুর্বলতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ে হামের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০০ শিশু মারা গেছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য দুই মন্ত্রীকে সারা দেশ সফরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
-পতাকানিউজ

