চাঁদ। পৃথিবী থেকে লাখো কিলোমিটার দূরে। সেই চাঁদের আড়াল থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? দেখার স্বাদ জাগলো বিজ্ঞানীদের মনে। তাইতে মানুষ পাড়ি দিলো চাঁদের কাছে। ঘুরলো চাঁদের চার পাশে। পৃথিবী নামক গ্রহটাকে দেখলো চাঁদের আড়ালে গিয়ে। এতো হাজার মাইল দূর থেকে পৃথিবী আসলে দেখতে কেমন? এতো ছোট্ট পৃথিবী নামক গ্রহে বসে মানুষ পৃথিবীতে কতো যুদ্ধ বিগ্রহই না করছে। আর তার চেয়ে লাখ মাইল দূরে চাঁদের দেশে কিংবা মঙ্গল গ্রহে কতোই না শান্তি!
সেই চাঁদ ঘুরে চার নভোচারী ফিরছে পৃথিবীর বুকে। সঙ্গে আনছে পৃথিবীর বাসিন্দাদের জন্য বড় সব সুখবর। চাঁদের কাছাকাছি থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? চাঁদকে কেমন দেখায়? পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা ৪০ মিনিটের পথই পাড়ি দিতেই বা কেমন গেছে নভোচারীদের অবস্থা? সবই আরো সচিস্তারে জানা যাবে যখন ফিরবেন নভোচারীর দল।
অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর মানবজাতির চন্দ্রযাত্রায় নতুন অধ্যায় রচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা’র ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশন। চাঁদের চারপাশ ঘুরে এখন পৃথিবীতে ফেরার পথে রয়েছে চার নভোচারী বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ১০ এপ্রিল প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মিশন ইতোমধ্যে মানব মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।
৫০ বছরের অপেক্ষার অবসান
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো যুগ শেষ হওয়ার পর এই প্রথম মানুষবাহী কোনো মহাকাশযান চাঁদের কাছাকাছি গিয়ে ঘুরে এসেছে। আর্টেমিস ২ মিশনে অংশ নিয়েছেন চার নভোচারী—রিড উইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদের দূর প্রান্ত ঘুরে তারা এখন পৃথিবীর দিকে ফিরছেন।
মিশন চলাকালে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছান-যা মানব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরে মানুষের ভ্রমণের রেকর্ড।
চাঁদের আড়াল থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন?
মিশনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো-চাঁদের কাছ থেকে তোলা পৃথিবীর নতুন ছবি। মহাকাশযান থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায়, চাঁদের রুক্ষ পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে ‘উদিত’ হচ্ছে নীল পৃথিবী-যাকে নতুন প্রজন্মের ‘আর্থরাইজ’ বলা হচ্ছে।
নাসা জানিয়েছে, ছবিগুলো ৬ এপ্রিল চাঁদের দূর প্রান্ত দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তোলা হয়। ছবিতে পৃথিবীর আলোকিত অংশে সাদা মেঘের ঘূর্ণি দেখা যায়, আর অন্ধকার অংশে রাতের ছায়া স্পষ্ট।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ছবি শুধু নান্দনিক নয়-এগুলো চাঁদের ভূতাত্ত্বিক গঠন, আলো-ছায়ার পরিবর্তন এবং মহাকাশ পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।

মহাকাশে বিরল দৃশ্যের সাক্ষী
এই অভিযানে নভোচারীরা একাধিক বিরল দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মহাকাশ থেকে দেখা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এবং চাঁদের অন্ধকার পাশে উল্কাপিণ্ডের আঘাতের ঝলক। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের বায়ুমণ্ডল না থাকায় সেখানে নিয়মিত উল্কাপিণ্ড আঘাত হানে-যা ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
একই সঙ্গে তারা চাঁদের পৃষ্ঠের গর্ত, লাভা প্রবাহ এবং ভাঙা ভূখণ্ডের হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। এসব তথ্য ভবিষ্যতের চন্দ্র অবতরণ মিশনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন অভিজ্ঞতা
পৃথিবীতে ফেরার আগে নভোচারীরা তাদের অভিজ্ঞতাকে ‘অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন’ বলে বর্ণনা করেছেন। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে ছোট একটি নীল গোলকের মতো দেখা তাদের কাছে গভীর উপলব্ধির মুহূর্ত তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ছবি ও অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে মহাকাশ অনুসন্ধানের প্রতি নতুন আগ্রহ তৈরি করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে।
এবার পৃথিবীতে অবতরণের পালা
সবকিছু ঠিক থাকলে আজই প্রশান্ত মহাসাগরে মহাকাশযানটির অবতরণ হওয়ার কথা রয়েছে। পুনঃপ্রবেশের সময় তাপঢাল ও গতির চাপ সামলানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলেই শেষ হবে প্রায় ১০ দিনের ঐতিহাসিক এই যাত্রা।
সামনে আরও বড় পরিকল্পনা
নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস ২ মিশনের সফলতা ভবিষ্যতে মানুষের চাঁদে অবতরণ এবং দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পথ খুলে দেবে। আর্টেমিস ৩ মিশনে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি গড়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে নাসা।

নাসা চাঁদ জয় করতে চায়। চায় মঙ্গল জয় করতে। সেখানে ঘাঁটি তৈরি করতে চায়। সেই ঘাঁটিতে বসে চালাতে চায় গবেষণা। যেসব গবেষণায় ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে পৃথিবীর অজানা বহু অধ্যায়। চাঁদ, মঙ্গল কিংবা ভূ-মন্ডলে হাজারো নক্ষত্ররাজি সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে। সেই জানার পরিধি বাড়াতে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সেই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতার জন্য ভবিষ্যতে আরো গবেষণা দরকার। যা করতে নাসা সবসময়ই জাগ্রত।
তথ্য সূত্র : নাসা
-পতাকানিউজ

