আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও মৌলভীবাজার–৪ (কমলগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল) আসনের নির্বাচনী সমীকরণ এবারও নির্ভর করছে ঐতিহ্যগত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত চা জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর।
এই আসনে বরাবরই নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন চা-বাগানের শ্রমিকরা। বিশাল এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভোট সাধারণত একদিকে গেলে জয়ের পাল্লাও সেদিকেই ভারী হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র চার দিন বাকি। ভোটের মাঠে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির তালিকাও ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এসে মৌলভীবাজার–৪ আসনের প্রায় সব প্রার্থীই চা-বাগান এলাকায় দৌড়ঝাঁপ বাড়িয়েছেন। শ্রমিকদের উপস্থিতিতে সভা-সমাবেশ করে দেওয়া হচ্ছে নানা আশ্বাস।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তারা। তবে সিলেট বিভাগের চা-বাগান শ্রমিকদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় আশ্বাসের হতাশা।
চা-শ্রমিকদের অভিযোগ, দশকের পর দশক ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে এবার তারা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চান, যিনি শুধু কথা নয়—বাস্তব কাজের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। সে কারণেই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগে এবার সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন চা-শ্রমিক ভোটাররা।
চা জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু ভোটাররা এতদিন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হলেও তাদের ভাষ্য, প্রার্থীরা কেবল নির্বাচনের সময়ই তাদের খোঁজ নেন। ভোট শেষ হলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকরা জানান, ভাঙাচোরা সড়ক, নিরাপদ পানির সংকট, পর্যাপ্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের অনুপস্থিতি এবং নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বছরের পর বছর ধরে তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের ১৫৮টি চা-বাগানে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাদের ভোট অনেক সময় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
কমলগঞ্জের চন্ডিছড়া চা-বাগানের শ্রমিক রতন ঘাটোয়াল বলেন, পরিবার চালাতে তিনি ছয় মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়েই কাজে যান। তিনি বলেন, “আমরা কাকে ভোট দেব? নির্বাচন শেষ হলে তারা আর আমাদের পাশে থাকে না।”
একই বাগানের শ্রমিক মেঘনা মৃধা বলেন, “আমরা এখনো ঠিক করিনি ভোট দেব কি না।”সিলেটের খাদিম চা-বাগানের শ্রমিক রঞ্জন কুর্মি বলেন, কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা সমাধানের কথা বললেও বাস্তবে কিছুই হয় না।
হবিগঞ্জের নোয়াপাড়া চা-বাগানের বাসিন্দা নয়ন বাউরি বলেন, এবার শ্রমিকরা আরও সচেতন থাকতে চান। “আমরা বুঝেশুনে ভোট দেব। যিনি সত্যিই আমাদের উন্নয়নে কাজ করবেন, তাকেই ভোট দেব।”
মৌলভীবাজারের চাতলাপুর চা-বাগানের তরুণ বাসিন্দা সুমন গোয়ালা বলেন, পর্যটন খাত পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হলে কাজের খোঁজে তাদের আর এলাকা ছাড়তে হতো না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সনাতনি হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন জানান, তারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রতীকে ভোট দিয়ে আসছিলেন। এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে ভোট দেবেন যোগ্য প্রার্থীকে। তারা বলেন, এই আসনের ছয়জন প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা ভোট প্রার্থনা করতে এসেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কমলগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্মল এস পালাশ বলেন, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি উদ্যোগ খুবই সীমিত। পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। বিএনপি প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি তার প্রধান অগ্রাধিকার।
এনসিপি প্রার্থী প্রীতম দাশ বলেন, নির্বাচিত হলে চা-শ্রমিক ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, পর্যটন আধুনিকীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হাওর ও টিলা অঞ্চলের সড়ক উন্নয়নে কাজ করবেন।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) প্রার্থী মো. আবুল হাসান বলেন, তিনি পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত উন্নয়নের পক্ষে। চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ভূমির মালিকানা অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি তার মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
পতাকানিউজ/এমআরআর

