সবুজ চা-বাগানের প্লান্টেশন এলাকার বুক চিরে বয়ে চলেছে পাহাড়ি ছড়া। ছড়ার দুপাশে বালুচরজুড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল এক কাশবন। শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর বাতাসে দুলতে থাকা শুভ্র কাশফুল-সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির আঁকা এক অপূর্ব ক্যানভাস। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের অদূরে ভাড়াইড়া চা বাগানের বেলতলী এলাকার ভুড়ভুড়িয়া ছড়ার পাশে কাশফুলের বাগান এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
শ্রীমঙ্গল শহরের মূল পয়েন্ট থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে ভানুগাছ সড়কের পাশে ভুড়বুড়িয়া পাহাড়ি ছড়ার দুই দিকের বালুচরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শোভা পাচ্ছে কাশফুল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ চা-বাগানের মাঝে কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে শুভ্রতার বিশাল চাদর। হালকা বাতাসে কাশফুলের দোল খাওয়ার দৃশ্য মুগ্ধ করছে পথচারী ও দর্শনার্থীদের।
শ্রীমঙ্গল থেকে ভানুগাছ সড়ক ধরে কিছুটা এগোলেই বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)। এর আশপাশজুড়ে রয়েছে উঁচু-নিচু টিলা আর বিস্তীর্ণ চা প্লান্টেশন এলাকা। সেই সবুজের মাঝ দিয়েই বয়ে গেছে পাহাড়ি ছড়া। বর্ষায় ছড়ায় পানি বাড়লেও পানি কমে যাওয়ার পর বালুচরে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয় কাশফুল। প্রতি বছর শরৎ মৌসুমে সেই কাশফুলই বদলে দেয় পুরো এলাকার দৃশ্যপট।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাশবনের শুভ্রতা দেখতে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছুটে এসেছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ কাশবনের ভেতরে ঢুকে ছবি তুলছেন, কেউ মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। আবার কেউবা ছড়ার পাড় ধরে হেঁটে উপভোগ করছেন নির্মল পরিবেশ। সড়কের পাশে ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়েও অনেককে তুলছেন ছবি।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিবছর আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে এখানে কাশফুল ফুটতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরজুড়ে পুরো বালুচর সাদা কাশফুলে ছেয়ে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ধীরে ধীরে কাশফুল ঝরতে শুরু করে। ফলে এ স্বল্প সময়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়ে যায়। তবে অনেক দর্শনার্থী কাঁশফুল ছিড়ে নিয়ে যান।
দর্শনার্থী সঞ্জয়, ফরিদা, মনিরা, কাকলী রায় বলেন, ‘শরৎ ঋতুর কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা কাশফুল। বই কিংবা ছবিতে কাশফুলের সৌন্দর্য অনেক দেখেছি। তবে প্রকৃতির এমন পরিবেশে দাঁড়িয়ে সরাসরি কাশবনের সৌন্দর্য উপভোগ করার অনুভূতিই আলাদা। তাই সময় করে এখানে চলে এসেছি।’
হামিদুর ও শাওন আহমেদ বলেন, ‘ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎ। চারপাশে রাশি রাশি কাশফুল ফুটে আছে। বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুল আর পাশের চা-বাগানের সবুজ দুটির সমন্বয়ে জায়গাটি অসাধারণ সুন্দর হয়ে উঠেছে। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে এসে এমন পরিবেশে সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘প্রতিবছর কাশফুল ফুটলে এখানে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। অনেকেই পরিবার নিয়ে আসেন, ছবি তোলেন এবং কিছু সময় প্রকৃতির মধ্যে কাটান। জায়গাটির সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে কাশবনে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা এবং কাশফুল ছিড়ে গাছপালা নষ্ট না করার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, ‘চায়ের রাজধানী হিসেবে শ্রীমঙ্গলের খ্যাতি দেশ-বিদেশে। এখানে চা-বাগানের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা অনেক জায়গা আছে। আট-দশ বছর ধরে কাশফুলের বালুচরটি সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শ্রীমঙ্গলে আসা পর্যটকরাও এখানে চলে আসেন প্রকৃতি দেখতে। কাশবন ও কাশফুলের সৌন্দর্য তাদেরকে বাড়তি বিনোদন দেয় নিঃসন্দেহে।’
শরতের মেঘভাসা নীল আকাশের নিচে সাদা কাশফুলের ঢেউ, পাশে সবুজের গালিচার মতো চা-বাগান আর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি ছড়া প্রকৃতির এ মেলবন্ধন যেন শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্যের নতুন এক অধ্যায়।
পতাকানিউজ/এমআরআর/আরবি

