`চা রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজার জেলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিরল এক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। বিশেষ করে জেলার চা বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিন পর ভোটের আমেজ ফিরে আসায় নারী-পুরুষ, তরুণ ও প্রবীণ ভোটারদের রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভোট শুরু হওয়ার আগেই অনেক ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে ভিড়ও বাড়তে থাকে। চা বাগান এলাকায় সাধারণত ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও এবারের নির্বাচনে ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গেছে। কেন্দ্রের ভেতরের পাশাপাশি বাইরেও উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত এই জেলায় দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর ভোটের পরিবেশ ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। ভোটারদের মতে, অতীতের কিছু নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সীমিত; অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা নিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় ভোটাররা নিজ উদ্যোগেই কেন্দ্রে এসে নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করছেন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্রগুলোতে লম্বা লাইন দেখা যায়। নারী, পুরুষ ও তরুণ ভোটাররা ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার অপেক্ষা করেন। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিদেশ থেকে দেশে এসে ভোট দিয়েছেন এমন প্রবাসীদের মধ্যেও ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। লন্ডন প্রবাসী নূর বক্স ও দেলোয়ার হোসেন আহাদ জানান, অতীতের নির্বাচনে বিভিন্ন কারণে তারা ভোট দিতে পারেননি। এবার দেশে এসে সরাসরি ভোট দিতে পেরে তারা আনন্দিত। একই সঙ্গে পোস্টাল ভোটের সুযোগ থাকায় প্রবাসীরাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন বলে উল্লেখ করেন তারা।
জেলার হেভিওয়েট প্রার্থীরাও সকালেই ভোট প্রদান করেন। ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এম. নাসের রহমান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নিজের ভোট দেন। একইভাবে কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী জহর লাল দত্ত, দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল মান্নান এবং ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আহমদ বিলাল নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের শাহ মোস্তফা কলেজ কেন্দ্রের (পুরুষ ও মহিলা) প্রিসাইডিং অফিসার মো. হুমায়ুন কবির ও মো. খালেদ হোসেন জানান, এই কেন্দ্রে মোট ৩১৬৭ জন নারী ও ৩০৫২ জন পুরুষ ভোটার রয়েছেন। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ভোট কাস্ট হয়েছে। তবে কিছু ভোটার ভোটার তালিকায় নাম খুঁজে পেতে বিড়ম্বনায় পড়েছেন বলে জানান তারা।
হাফিজা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ৩৯৯১ ভোটারের এই কেন্দ্রে সকাল ৯টা পর্যন্ত শতাধিক ভোট কাস্ট হয়েছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে মোট ভোটার ২১৭৭ জন; এর মধ্যে নারী ভোটার ১০৯৯ জন। সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
শ্রীমঙ্গলের চা বাগান এলাকাগুলোতেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কালীঘাট চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার ড. শামীম আল মামুন। একই উপজেলার ফুলছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সোয়া ১১টা পর্যন্ত প্রায় ২৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন চা শ্রমিক ভোটাররা।
খেজুরিছড়া চা বাগানের র্যানার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে নারী ভোটার সংখ্যা ২১৭৪ জন। প্রাথমিকভাবে উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
জেলার উপজেলা প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, চারটি সংসদীয় আসনের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রেই ভোটার উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক ও প্রাণবন্ত।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী অধ্যুষিত এ জেলায় এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ২৩ হাজার ৭৩৬ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পোস্টাল ভোট ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত জেলার কোথাও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৬ জন; এর মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে মাঠে রয়েছেন ৩৬ জন এক্সিকিউটিভ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বিজিবির ১৫টি স্ট্রাইকিং টিম, আনসার ব্যাটালিয়নের ১৫টি ইউনিট, পুলিশের ১৪টি দল, র্যাবের ৮টি ইউনিট এবং সেনাবাহিনীর ২১টি টিম মোতায়েন রয়েছে। পুলিশের ৫৩টি মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
জেলার মোট ভোটকক্ষ সংখ্যা ৩১০৫টি। প্রতিটি কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সদস্যদের জন্য বডি-ওন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ১১ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য জেলার চারটি আসনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
-পতাকানিউজ/এসআই

