আজ বাংলাদেশ বিদায় জানালো সকলের অন্যতম প্রিয় গল্পকারকে। ‘তিন গোয়েন্দা’ র স্রষ্টা রকিব হাসান আর নেই। যাওয়ার কালে কিংবদন্তি এই লেখক রেখে গেছেন অগণিত পাঠকের হৃদয়ে এক অপূর্ণ শুণ্যতা, যাদের কৈশোর কেটেছে কিশোর, মুসা, রবিনের সঙ্গে রহস্যের জগতে ঘুরে বেড়িয়ে।
সেবা প্রকাশনীর মাসুমা মাইমুর জানান, ডায়ালাইসিস চলাকালীন সময় হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাহিত্য অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর পাঠকদের কাছে তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, বরং ছিলেন শৈশব কৈশোরের স্মৃতি।
কৈশোরের শীতল বিকেলে স্কুল ছুটির দিনে কেউ কম্বল গায়ে দিয়ে, কেউ আবার রাতে টর্চলাইটের আলোয় লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তো তিন গোয়েন্দা।
তিন গোয়েন্দা শুধু একটি বই নয়- একপ্রকার আসক্তি। প্রায় প্রতিটি কিশোরের হাতে দেখা যেতো এই বইটি। কিশোর, মুসা, রবিন যেনো আমাদের বন্ধুদের মতোই মনে জায়গা করে নিয়েছিলো। এই অসাধারণ চরিত্রগুলোর আড়ালে ছিলো এই তিন চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা রকিব হাসান। তিনি গোটা একটা প্রজন্মকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন রহস্য পাশের বাড়িতেও লুকিয়ে থাকতে পারে।
রকিব হাসান ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার সরকারি চাকরির কারণে শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ফেনীতে। সেখানেই পড়াশোনা শেষ করে পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কিছুদিন চাকরিও করেছেন, তবে অফিসের সেই একঘেয়ে জীবনে তাঁর মন টিকেনি। অবশেষে তিনি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
তাঁর সাহিত্য জীবনের যাত্রা শুরু হয় সেবা প্রকাশনীতে। এই প্রকাশনী পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন যুগের সূচনা করে। প্রথমে তিনি বিখ্যাত কিছু ক্লাসিক উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেন যেনো দেশী পাঠকরা বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বিশ্বসাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেই সৃষ্টি করেন নতুন চরিত্র ও নতুন এক সাহিত্য জগত।
দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে রকিব হাসান লিখেছেন ৪০০টিরও বেশি বই। তাঁর জনপ্রিয় সিরিজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘টারজান, ‘ডিটেকটিভ রাজু ও ‘রেজা-সুজা। প্রতিটি গল্পেই ছিল রোমাঞ্চ, বুদ্ধিমত্তা ও তরুণ পাঠকের নাগালের সহজতা। তবে ‘তিন গোয়েন্দা’-র জনপ্রিয়তা অতুলনীয়।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘তিন গোয়েন্দা’ মূলত রবার্ট আর্থারের ‘দ্য থ্রি ইনভেস্টিগেটর্স’ সিরিজ অবলম্বনে রচিত হলেও, রকিব হাসানের কলমে এটি নতুনভাবে প্রাণ পায়। তিনি কেবল পশ্চিমা গল্প অনুবাদ করেননি, বরং সেটিকে মন দিয়ে সাজিয়েছেন। তাঁর গল্পে ছিলো আমাদের মাটি ও সংস্কৃতির আবহ। আরও ছিল বাংলা হাস্যরস, কিশোর বয়সের ভয়, আর আমাদেরই মতো জীবন্ত চরিত্র।
আজও কোথাও না কোথাও কোনো কিশোর হয়তো ‘তিন গোয়েন্দা’-র একটি বই খুলে বসে। রকিব হাসান চির অমর হয়ে থাকবেন তাঁর সৃষ্টি করা লেখা আর চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
পতাকানিউজ/কেএ

