চীন, রাশিয়া ও ইরান সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় যুদ্ধজাহাজ নিয়ে একটি যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজন করেছে। এই মহড়া কেবল সামরিক প্রাকটিস নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও শক্তি সম্পর্কের একটি জটিল ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাই এই মহড়ার আয়োজনকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন।
মহড়া
সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাইমনস টাউনের প্রধান নৌঘাঁটিতে, যেখানে বিভিন্ন দেশের যুদ্ধজাহাজ একত্রিত হয়েছে। এটি সপ্তাহব্যাপী চলছে ৯ জানুয়ারি থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। মহড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। মূলত এই মহড়া ব্রিকস প্লাস দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ব্রিকস -মূলত অর্থনৈতিক জোট। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মূল দেশগুলো ছিল—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ সালে যুক্ত হওয়ার পর নামের শেষে ‘এস’ যুক্ত হয়। বর্তমানে এই জোটে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও অংশগ্রহণ করছে, তাই নতুন নাম ব্রিকস প্লাস।
মহড়ার উদ্দেশ্য
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য—যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, সমন্বিত নৌ-মহড়া এবং সমুদ্র সুরক্ষার বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা স্পষ্ট করে জানায়নি কোন দেশ কীভাবে অংশ নিচ্ছে, তবে এ বিষয়ে তারা সতর্ক: মহড়া ‘নিরপেক্ষ’ বা কূটনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানোর উদ্দেশ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব
এই মহড়ার আয়োজন ঘটে এমন সময়ে, যখন দক্ষিণ আফ্রিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ আফ্রিকা শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু জনগণের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা। দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমিকা আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ অভিযোগে যুক্ত থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ এবং ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আরোপ করেছে এবং দেশের সহায়তা স্থগিত করেছে।
সম্পর্ক মেরামত করতে ২০২৩ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ও হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের হত্যা নিয়ে তীব্র প্রশ্নবাণে সফরটি ব্যর্থ হয়।
মহড়ার রাজনৈতিক অর্থ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্রিকস প্লাসে সামরিক মহড়া আয়োজন মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক জোট হলেও, এতে রাজনৈতিক বার্তাও নিহিত রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডিন উইংরিন বলছেন, “দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনাকে জটিল করতে পারে। সমস্যা মহড়ার সঙ্গে নয়, বরং এর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত।”
প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নেয় ২০১৯ সালে, যার নাম ছিল ‘মোসি’। তখন মহড়া নিয়ে বিশেষ উত্তেজনা হয়নি। তবে ২০২৩ সালে মোসি-২ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় অভিযান চালাচ্ছিল, তাই মহড়াকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। বর্তমান মহড়ার নামকরণ করা হয়েছে ‘BRICS Plus Naval Exercise’, যার স্লোগান ‘Will for Peace’—শান্তির সংকল্প।
অন্তর্দেশীয় বিতর্ক
ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (DA) মহড়ার তীব্র সমালোচনা করেছে। দলটির প্রতিরক্ষা মুখপাত্র ক্রিস হ্যাটিং বলেন, “এই মহড়া দেশের নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চীন, রাশিয়া ও ইরান—উভয়ই নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতে যুক্ত।” তবে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী বান্তু হলোমিসা সমালোচনা উপেক্ষা করে বলছেন, “সেনাদের মনোবল ও দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সম্মানের জন্য এই মহড়া গুরুত্বপূর্ণ।”
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনও চীনের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যেখানে চীনের কোম্পানি সর্বোচ্চ ২০ হাজার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে চীন দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৪ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
নতুন ৩০% শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমলে ১ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক ইতিহাস
আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর বাণিজ্যিক ও পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষক উইংরিনের মতে, “মহড়া সামরিক দিক থেকে সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে না। তবে এটি কিছু দেশকে দক্ষিণ আফ্রিকার নীতির প্রতি আরও সতর্ক হতে বাধ্য করবে। মূল সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক বার্তা।”
অর্থাৎ, মহড়া শুধু সামরিক অনুশীলন নয়, এটি দক্ষিণ আফ্রিকার বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শক্তি সমীকরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিল চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
-সূত্র : বিবিসি
-পতাকানিউজ

