চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। যেখানে বহিরাগত প্রবেশে ছিল কড়াকড়ি। এছাড়া অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হতো। ২০১৭ ও ২০১৯ সালে উচ্ছেদে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয় জেলা প্রশাসনকেও। এছাড়া একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করে চিহ্নিত সন্ত্রাসী আটকসহ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ইতিমধ্যে সেখানে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের অবৈধ বসতি। এসব জায়গা দখল-বেদখল কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। দুর্গম ওই পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীরা আবারও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এবার বিষয়টি স্বীকার করলেন খোদ জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু নিজেই।
তিনি বলেন, ‘এলাকার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে ভারি অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ছাড়া পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের কারণে এখন এটি পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীন অঞ্চলে।’
মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আয়োজিত সভায় জেলা পুলিশ সুপার এসব কথা বলেন।
যা বললেন পুলিশ সুপার
সভায় জেলা পুলিশ সুপার জানান, জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে এর আগে কখনও সঠিকভাবে রিপোর্ট করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এলাকাটির মূল সমস্যা খাস জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে সেখানে একদল প্রভাবশালী ও দখলদার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে এমন একটি অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষও মানসিকভাবে যেন এক ধরনের আতঙ্কে আবদ্ধ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় বহুবার অভিযান চালানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি।’
পুলিশ সুপার জানান, এলাকায় বর্তমানে এমন অবস্থা বিরাজ করছে যে ভারি অস্ত্র ছাড়া সেখানে পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এমনকি প্রয়োজনে তিনি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনার ও পরিকল্পনার কথাও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার দাবির বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের তার কাছে আসায় তিনি বিব্রত। কারণ বিচার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ হামলার ঘটনার তদন্ত চলছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে আশ্বস্ত করেন হামলায় জড়িতদের দ্রুত সময়ে আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি জানান, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যারা সিএনজি অটোরিকশা চালক, দোকানদার বা স্থানীয় বাসিন্দা তাদের অনেকেই সন্ত্রাসী চক্রের প্রভাববলয়ে রয়েছেন। এ চক্রের পেছনে কেউ রাজনৈতিকভাবে জড়িত থাকলেও তাদের মুখোশ উন্মোচন করার আহ্বান জানান তিনি।
সাংবাদিকদের ক্ষোভ ও দাবি
সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, দেশের অন্য যেকোনো ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের কয়েকজন সদস্যেরও ওই এলাকায় জায়গা থাকার তথ্য উঠে রয়েছে বলে জানান সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকরা আরও জানান, জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে এবং সুযোগ পেলেই সলিমপুরে গিয়ে দখল, ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজি কার্যক্রম চালায়। সাংবাদিকদের দাবি, এসব তথ্য প্রশাসন ভালোভাবেই জানে।
সাংবাদিকরা বলেন, ‘হামলার ঘটনার পরও প্রশাসনের নীরব ভূমিকা এটা স্পষ্ট যে, জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান এখনও দুর্বল।’
কি হয়েছিল সেদিন?
গত ৫ অক্টোবর সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন এখন টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ও বিশেষ প্রতিনিধি হোসাইন জিয়াদ, তার সহকর্মী চিত্র সাংবাদিক পারভেজ এবং গাড়িচালক। সেখানে খবর সংগ্রহ করতে গেলে হঠাৎ সন্ত্রাসীদের একটি দল তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
জঙ্গল সলিমপুর বহু বছর ধরে খাস জমি দখল, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে আলোচনায় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কিছু প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্নভাবে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষ এখন সেখানে আতঙ্কে বসবাস করছে।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ উভয় সংস্থা এলাকাটিতে বহুবার অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু অপরাধী চক্রগুলোর প্রভাব পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি। বরং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং আইনি জটিলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধ জগতের ভয়ঙ্কর চিত্র।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, জঙ্গল সেলিমপুরের পরিস্থিতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, এখন টিভির ব্যুরো প্রধান ও চট্টগ্রাম টেলিভিশন রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক (সিটিআরএন)-এর আহ্বায়ক হোসাইন জিয়াদ, সিটিআরএন- এর যুগ্ম আহ্বায়ক একে আজাদ, নির্বাহী সদস্য আরিচ আহমেদ শাহ ও সৈয়দ তাম্মিম মাহামুদসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিকরা।
সিনিয়র সাংবাদিক শাহনেওয়াজ রিটনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের টিভি ইউনিট প্রধান তৌহিদুল আলম, সাংবাদিক সোহাগ কুমার বিশ্বাস, লতিফা আনসারী রুনা, আকরাম হোসেন, মুজিবুল হক, আহমেদ রাকিব, সাইফুল ইসলাম এবং ক্যামেরা জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এনামুল হক।
পতাকানিউজ/এমএফ/আরবি

