চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। যার পরিচিতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যেই নয় বরং দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব ও সহিংসতার ইতিহাস দিয়ে। এ পাহাড়-টিলাজুড়ে হাজার হাজার ‘ছিন্নমূল’ মানুষের বসবাস। কিন্তু সেই বসবাস বারবার রূপ নেয় সহিংসতায়। কারণ জঙ্গল সলিমপুরে আয়ের বড় উৎস চাঁদাবাজি ও খাস জমি প্লট করে বিক্রি। তাই বিপুল পরিমাণ খাস জায়গা দখল-বেদখলকে মরিয়া একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের লড়াইয়ে প্রায়ই রক্তাক্ত হয়ে উঠে ওই এলাকা। আগে এ বসতি স্থাপন ও পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণ করত তৎকালীন সরকার দলীয় কিছু লোক। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সেই অপরাধের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে নিতে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে চলছে দখল-পাল্টা দখলের খেলা। এসবের নেপথ্যে বর্তমানে রয়েছে-ইয়াসিন, রোকন মেম্বার ও লাল বাদশা থেকে শুরু করে আরও অনেকে।
এসব বিষয়ে কথা হয় ছিন্নমূল এলাকায় বসবাসরত কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এক দশকেরও বেশি সময় আগে আলী নগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতো আক্কাস নামে একজন। তার সহযোগী ছিল মোহাম্মদ ইয়াসিন। ওই সময়ে ইয়াসিন আমিন জুট মিলে কর্মরত ছিল। যদিও এর আগে সে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতো। ২০১১ কিংবা ১২ সালে র্যাবের অভিযানে ক্রসফায়ারে নিহত হয় আক্কাস। এরপর প্রায় ২ বছর ইয়াসিন এলাকা ছেড়ে পলাতক ছিল। পরে আবার ফিরে এসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে ইয়াসিন। জুট মিলের শ্রমিক থেকে বনে যায় আলী নগরের বাদশা।’
অপর এক বাসিন্দা জানান, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ পুলিশ-আনসারদের ওপর হামলার পর গ্রেপ্তার হয় ইয়াসিন। ওই সময় রিদোয়ান নামে একজন ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো। এছাড়া যারা অন্যায়কারী তাদের শাস্তি দিতো নিজেই। কিন্তু সে বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেনি। ইয়াসিন জামিনে বেরিয়ে এসে তাকে বেধড়ক মারধর করে। মৃতপ্রায় রিদোয়ান সেই সময় কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। পরে সে বিদেশ চলে যায়। ওই সময় ইয়াসিন সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছত্রছায়ায় এলাকা ফের দখলে নেয়। পাহাড় কেটে বানিয়েছে প্লট, করেছে বিক্রিও। ওই সময় তার নিয়ন্ত্রণে ছিল শুধুমাত্র আলী নগর। যেখানে সে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে একক সাম্রাজ্য গড়ে তুলে।
তিনি আরো জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পতন ঘটে ইয়াসিনের। তার দাপট কমে আসে। একই সময়ে ফের আবির্ভাব ঘটে রিদোয়ানের। এবার সে একা নয়। রোকন মেম্বার, রাজুসহ আরও অনেককে সঙ্গে নিয়ে নামে মাঠে। ইয়াসিনকে উচ্ছেদ করার পণ নিয়ে নামলেও তারা বেশিদিন টিকতে পারেনি। সেই সময় তারা আলীনগরসহ ছিন্নমুল দখলে নেয়। কিন্তু গত কয়েকমাস আগে সেনাবাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয় রিদোয়ান। এরপর ফের আধিপত্য শুরু হয় ইয়াসিনের। এরপর রাজুর দোকান, গাড়িসহ ব্যাপক ক্ষতি করে ইয়াসিন বাহিনী।
ছিন্নমূল এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু আলী নগর নয় এবার ছিন্নমূলসহ দখলে নিয়েছে ইয়াসিন। যদিও সব সরকারি জমি। কিন্তু প্রশাসনের নজরদারির বাইরে থাকায় তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে গহিন এলাকায়। বসবাসকারীদের হুমকি দিয়ে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের লাইন কেটে দিয়েছে ইয়াসিন। সেখানে থাকতে হলে তাকে ৫০ হাজার টাকা করে দিয়ে লাইন নিতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে।’
শুক্রবার, ৩ অক্টোবর দু’পক্ষের সংঘর্ষের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২ হাজার লোক সমাগম ঘটে ওই এলাকায়। মূলত ইয়াসিনকে বিতারিত করতে এ উদ্যোগ নেয় রোকন মেম্বার, লাল বাদশা, রাজুসহ আরও অনেকে। এতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে। তারা পরিকল্পনা করে আলী নগরের ৩টি গেট দিয়ে প্রবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তাদের মধ্যে মিস কমিউনিকেশন হয়। ফলে সামনের গেট দিয়ে রোকন মেম্বাররা প্রবেশ করে হুমকি-ধামকি দিয়ে বেরিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপরদিকে পেছনের গেট দিয়ে প্রবেশ করে লাল বাদশার দল। এর আগে রোকন মেম্বারের দল হুমকি-ধামকি দেয়ায় সতর্ক অবস্থানে চলে যায় ইয়াসিন বাহিনী। পরে লাল বাদশার দল এলাকায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর হামলা চালায় ইয়াসিন গ্রুপ। এসময় কালু নামে একজন মারা যায় এবং ১৬ জন আহত হয়। যদিও অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। কিন্তু তা কেউ জানতে পারবে না। কারণ এ গহিন অরণ্যে জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। মরদেহ তো কথায় নেই।’
তেমনই এক ঘটনা ওঠে এসেছে পতাকানিউজের অনুসন্ধানে। আলী নগরে হামলার ঘটনার দিন থেকে মো. রিপন নামে এক ইট-বালু ব্যবসায়ী আমদানি তুলতে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। সীতাকুণ্ড থানায় বারবার গিয়েও মামলা করতে পারেনি রিপনের পরিবারের সদস্যরা। পুলিশের কাছ থেকে আশানুরূপ কোনো প্রতিশ্রুতিও তারা পাননি বলে জানিয়েছেন রিপনের ভাগিনা শাকিল।
সোমবার, ৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৭টায় তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘রিপন মামা ছিন্নমূলের খেজুরতলা এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে ইট-বালু দিয়েছেন। সেখান থেকে আমদানি তুলতে শুক্রবার সকালে সেখানে যায়। তার কাছে আনুমানিক ৪ লাখ টাকার মত ছিল। কিন্তু ওইদিন তিনি সেখানে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ হন।’ এ ঘটনায় অপহরণ মামলা করতে গেলে সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ সহযোগিতা করেননি বলে জানান।
জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা জিডি নিয়েছি। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।’
শুক্রবারে হত্যাসহ সংঘর্ষের ঘটনায় কতজনকে গ্রেপ্তার করেছে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের পেজে দেয়া হয়েছে। সেখানে দেখুন।’
এদিকে জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য স্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এলাকার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে ভারি অস্ত্র ছাড়া পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের কারণে এখন এটি পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীন অঞ্চলে।’
পতাকানিউজ/আরবি/কেএস

