ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নিজ জেলা বগুড়ায় দলের হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেলায় সংসদীয় সাতটি আসনের মধ্যে দুটি হাতছাড়ার মাধ্যমে দলের দুর্গ নড়বড় হয়ে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসনই হাতছাড়া হয়। আগামী নির্বাচনে সব কটি আসন নিজেদের কাছে রাখতে তৎপর দলটি।
এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার সাতটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৬টিতে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। ঘোষণা অনুসারে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে পুরোনোরাই বেশি। মাত্র দুটি আসনে নতুন মুখ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন মুখ হলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং আবদুল মুহিত তালুকদার।
বগুড়া-২ এ মান্না নাকি মীর শাহে আলম
প্রার্থীদের মধ্যে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি কাজী রফিকুল ইসলামকে। তিনি একাধিকবার ওই আসনের এমপি ছিলেন। এবারও তিনি মনোনয়রন পেয়েছেন।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে কাউকেই মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, যুগপদ আন্দোলনের সঙ্গী নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হতে পারে। তবে এই আসনে বিএনপি শক্ত প্রার্থী উপজেলা সভাপতি মীর শাহে আলম দাবি করেছেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে ফোনে সবুজ সংকেত দিয়েছেন।’ এরপর থেকেই তিনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সভা-সমাবেশ গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, দোয়া মাহফিল করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। প্রতিটি সভাতেই বাঁধ ভাঙা মানুষের উপস্থিতি নজর কাড়ছে ভোটারদের।
বগুড়া-৩ এ নতুন মুখ মুহিত
বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন আদমদীঘি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মুহিত তালুকদার। তিনি এ আসনে নতুন মুখ। এর আগে এই আসনে তার বাবা মজিদ আলী তালুকদার তিন দফা এমপি ছিলেন। এরপর তার বড় ভাই আব্দুল মোমেন তালুকদার দুই দফা এমপি ছিলেন। ২০১৮ সালে তার ভাবী মাসুদা মোমেন মনোনয়ন পান কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনগত জটিলতায় ভোট করতে পারেননি। বলতে গেলে এটি তাদের পারিবারিক আসন। এবার তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন দুই বার এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন ১বার।
বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে সাবেক এমপি, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন ও বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে সাবেক এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজকে দেয়া হয়েছে। তারা দুইজন পুরাতন মুখ।
বগুড়া-৬ এ তারেকে ভরসা
বগুড়া-৬ (সদর) আসনে এবার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই প্রার্থী হয়েছেন। তবে সবার ধারণা ছিল তারেক রহমান পিতার জন্মভূমি বগুড়া-৭ ((গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে প্রার্থী হবেন। কিন্তু তা না হয়ে তিনি বগুড়া- ৬ সদরে প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে তিনি নতুন মুখ। এর আগে তিনি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনে বগুড়া-৭ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সেই সময় তার আসনে অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি নির্বাচিত হবার ১১ আগেই সেই নির্বাচন স্থগিত করে দেয়া হয়। তারপর এবারই প্রথম তিনি প্রার্থী হয়েছেন।
২০০৮ সাল পর্যন্ত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন বিএনপির দখলে ছিল। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারবার সংসদ সদস্য হন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাপার নুরুল ইসলাম বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তিনি শপথ না নেয়ায় উপ-নির্বাচনে বিএনপির গোলাম মো. সিরাজ বিজয়ী হন। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করলে আরেকটি উপ-নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান বিজয়ী হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হন।
বগুড়া-৭ এ ফিরলেন খালেদা
এদিকে বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ি গাবতলী উপজেলায়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও এ আসনে খালেদা জিয়া বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ২ লাখ ৩২ হাজার ৭৬১ ভোট পান। তবে প্রতিবারই খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচন হয়। তিনটি উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার। এই আসনেই এবার বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রার্থী হয়েছেন।
বগুড়ার জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সাবেক এমপি মোশারফ হোসেন জানান, ‘বগুড়ার ছয়টি আসনে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও অন্যদের নাম ঘোষণা করায় তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন।’
ভাগ বসাতে মরিয়া জামায়াত
এদিকে বসে নেই নির্বাচনী জোটে একসময়ের শরিক দল জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির দুর্গে ভাগ বসাতে মরিয়া তারা। ইতোমধ্যে সংসদীয় সাত আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের তৎপরতা ও সরব উপস্থিতি চোখে পড়লেও জাতীয় নাগরিক পার্টি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাকের পার্টি, সিপিবিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি।
পতাকানিউজ/পিএম/এএইচ

