সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ছে মানুষের কর্মব্যস্ততা। সে সময় মাছ কিনতে একটি পিকআপ ভাড়া করে ১০ জন মিলে যাচ্ছিলেন নগরীর ফিশারী ঘাটে। প্রতিদিনের মতো করে তারা আজও জীবিকার তাগিদে ভোরের আলো ছড়ানোর আগে বের হয়েছিলেন। তবে সেই তাগিদ কেড়ে নেয় তাদের জীবন। নগরীর সিটি গেট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ জনের মৃত্যু হয়, সোমবার ১৮ আগস্ট ভোরে। এতে আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরও ৪ জন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সোমবার ভোর ৬টার দিকে সিটি গেট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যানের পেছনে শহরমুখী একটি পিকআপ ভ্যান ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে পিকআপ ভ্যানটির পাঁচ যাত্রী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন আকাশ দাস (২৬), অজিত দাস (২৪), রনি দাস (২৫), জুয়েল দাস (১৮) ও মো. সোহাগ (৩২)। নিহতরা সবাই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে।
আকবর শাহ থানার এসআই মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছেন। লাশ পুলিশ হেফাজতে আছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। চালক এখনো পলাতক রয়েছে।

জানা যায়, ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হয়। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনায় আহত আরও ৪ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। আহতরা হলেন, শুবল দাস, দিপু দাস, রিংকু দাস।
পরিবারের ভরসা যারা ছিলেন, তারাই নেই আজ
নিহতদের পরিবারের সকলের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। এদের মধ্যে আকাশ ফৌজদারহাট দক্ষিণ পাড় জেলে পাড়ার বাসিন্দা তিনি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান, চার বোনের এক ভাই তিনি। বাবা দেশের বাইরে থাকলেও পারিবারিক অস্বচ্ছলতায় কিছুটা যোগান দিতে নিজেও নেমে যান কাজে। প্রতিদিন কর্মব্যস্ততা শেষে নিজের পরিবারের কাছে হাসিমুখে ফেরত গেলেও এবার ফিরলেন লাশ হয়ে।
একই এলাকার অজিত দাসের পরিবারে মা, স্ত্রী, বোন ও নিজের ছেলে মেয়ে সহ সর্বমোট ১১ জন। দুই ভাই থাকলেও আয়ের অন্যতম অবলম্বন ছিলেন তিনি। রনি দাশের বাড়ি নগরীর পতেঙ্গা হলেও তিনি জায়গা জমির বিরোধ ও মাকে নিয়ে ভালো থাকতে আশ্রয় নেন নানার বাড়ি। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট তিনি। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি নিজেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সোহাগ ও জুয়েল দাশের বাড়ি বারো আউলিয়া। তারা প্রতিদিন সেখান থেকে পিকআপ নিয়ে বাকিদের তুলে চলে যান মাছের আড়ৎ ফিশারী ঘাটে। সেখান থেকে মাছ কিনে কর্নেল হাট থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ড বাজার পর্যন্ত মাছ নিয়ে যান তারা।
ভোরের আলো ফুটল, কিন্তু সকাল হলো না
নিহতদের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনরা জানান, নিহতরা প্রতিদিন ভোরে সীতাকুণ্ড থেকে ফিশারিঘাটে মাছ কিনতে আসত। তারা পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে বিভিন্নস্থানে বিক্রি করত।

পুলিশ জানায়, পিকআপ ভ্যানটির সামনে তিনজন ও পেছনে সাতজন যাত্রী ছিলেন। নগরের সিটি গেট এলাকায় এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যানের পেছনে ধাক্কা দেয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় আরও চারজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রত্যক্ষদর্শী সিটি গেইটের পাশের একটি ডিপোর প্রহরী ইয়াসিন বলেন, আমি ডিউটিতে ছিলাম, হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই। দৌঁড়ে এসে দেখি এখানে রক্তাক্ত অবস্থায় মানুষ সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরপর আরও কয়েকজন মানুষ এগিয়ে আসে। দেখি চালক স্টিয়ারিংয়ে ফেঁসে আছে। পরে তাকে উদ্ধার করি। এরপর হাসপাতালে পাঠায়।
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

