জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ ও গণভোটের সময়সূচি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ঐকমত্যের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখন ক্রমেই দূরহ হয়ে উঠছে। সরকারের আহ্বান সত্ত্বেও দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসতে পারছে না। সময়সীমা শেষ হয়ে আসলেও কোনো ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত নেই—ফলে শেষমেশ সরকারকেই একক সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই অচলাবস্থার মূল কারণ বিএনপির অনাগ্রহ। দলটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে নয়—শুধু সরকারের আমন্ত্রণে আলোচনায় বসবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অন্যদিকে সরকার গত ৩ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিল। বলা হয়েছিল, সরকার আলোচনার আয়োজন করবে না; বরং দলগুলো যদি এক সপ্তাহের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব দিতে না পারে, তাহলে সরকার নিজের মতো করেই পদক্ষেপ নেবে। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে সোমবার।
এই সময়ের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী আলোচনা শুরুর একটি উদ্যোগ নেয়। তারা দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিএনপিকে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিএনপি সেই প্রস্তাবে কোনো সাড়া দেয়নি। উল্টো দুই দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এখন তীব্র রূপ নিয়েছে।
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি ও গণভোটের আহ্বান জানিয়ে আগামী মঙ্গলবার ঢাকায় বড় সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচিতে যাবে। ওই সমাবেশেই জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সরাসরি বলেন, “সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে, আঙুল বাঁকা করব।”
অন্যদিকে বিএনপি এই ধরনের হুমকি বা রাস্তার আন্দোলনের ইঙ্গিতকে বিপজ্জনক বলছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শনিবার এক সভায় মন্তব্য করেন, “কথায় কথায় রাস্তায় নামলে সংঘর্ষ হবে না?”—যা মূলত জামায়াতের সমাবেশের দিকেই ইঙ্গিত করে বলা।
এই বক্তব্যের জবাবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, বিএনপির বর্তমান আচরণ আওয়ামী লীগের আগের শাসনের মতোই হয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “পতিত শেখ হাসিনার সময় যেমন বলা হতো, ওদের সঙ্গে বসব না—এখন বিএনপিও সেই সংস্কৃতি চালাচ্ছে।”
এদিকে, গণতন্ত্র মঞ্চসহ নয়টি দল বিএনপি ও জামায়াতকে এক টেবিলে আনতে আলাদা আলোচনা চালাচ্ছে, তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মঞ্চের নেতা জোনায়েদ সাকি বলেন, “আমাদের চেষ্টা চলছে, কিন্তু দুই বড় দল নিজেদের অবস্থান থেকে নড়ছে না।”
অন্যদিকে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ব্যঙ্গ করে বলেন, “সবাই সমঝোতা চায়, কিন্তু কেউ আলোচনা করতে রাজি নয়। কেউ আঙুল বাঁকা করবে, কেউ বলবে সরকার ডাকুক—এই অবস্থায় ঐকমত্য আসবে কীভাবে?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি মধ্যস্থতা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগও আগেই থেমে গেছে। কমিশন গত সেপ্টেম্বরে দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানালেও তাতে বাস্তব ফল আসেনি।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, “আমরা সরকারের ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট নই, তবে দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আলোচনা চালাচ্ছি। এখন বড় দলগুলোকে ছাড় দিতে হবে, নইলে অচলাবস্থা ভাঙবে না।”
সর্বোপরি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে যে রাজনৈতিক ঐক্যের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা এখন জটিল এক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। কেউ আলোচনা চায় না, কেউ নেতৃত্ব নিতে সাহস পাচ্ছে না। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন—সেই প্রশ্নই এখন দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
পতাকানিউজ/এনটি

