জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা এবং কার্যকর করার পদ্ধতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
রোববার (১০ আগস্ট) সংসদ ভবনের এলডি হলে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে ছয়জন আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে এ বিষয়ে একাধিক বিকল্প মতামত এসেছে। আলোচনায় উঠে এসেছে গণভোট, সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ ব্যবস্থা, এমনকি অধ্যাদেশ জারির মতো বিকল্পও।
বৈঠকে উপস্থিত সূত্রগুলো জানায়, বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সংস্কারপ্রক্রিয়া এগোলে বিকল্পের সুযোগ সীমিত। সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ধারা নেই, তবে বর্তমান সরকার জনগণের ক্ষমতার প্রয়োগ এবং উচ্চ আদালতের রেফারেন্সের মাধ্যমে গঠিত—এ কারণে তাদের সংস্কার বাস্তবায়নের এখতিয়ার রয়েছে। কেউ কেউ প্রস্তাব দেন, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে জুলাই সনদকে সংবিধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার প্রস্তাব এসেছে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন নিশ্চিত হলে এবং আদালত ইতিবাচক মত দিলে সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব।
আলোচনায় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেও কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা ওঠে। তবে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিষয়ে এ পথে জটিলতা হবে বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন, কারণ অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়। প্রোক্লেমেশন বা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) মাধ্যমে সনদ কার্যকর করার বিকল্পও এসেছে আলোচনায়।
সূত্রগুলো জানায়, কিছু সংস্কারপ্রস্তাব এখনই অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা যেতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সরকার সংসদে অনুমোদন না দিলে এসবের কার্যকারিতা হারাবে। তাই পুরো সনদকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অনেকেই।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে চলছে। আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে মতামত সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে।
শুক্রবার (০৮ আগস্ট) কমিশন জানিয়েছিল, বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দল উভয়ের মতামতের ওপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে কমিশন।
জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের পর গঠিত সরকার দুই বছরের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে—এ প্রস্তাবে বিএনপি একমত হলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি দল মনে করে শুধু অঙ্গীকার নয়, সনদকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
রোববারের (১০ আগস্ট) বৈঠকে বিচারপতি (অব.) এম এ মতিন, বিচারপতি (অব.) মইনুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, আইনজীবী তানিম হোসেইন ও ইমরান এ সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। কমিশনের পক্ষ থেকে সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ ছাড়াও সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন, মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বৈঠকে যোগ দেন।
পটভূমিতে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। ফেব্রুয়ারিতে কমিশনগুলো প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত ঐকমত্য কমিশন ছয় কমিশনের সুপারিশ দুই ভাগে ভাগ করে—১৬৫টি আশু বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব বাস্তবায়নের কাজ চলছে, আর বাকি ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে দুই দফা আলোচনা শেষে ৮২টিতে ঐকমত্য ও ৯টিতে ভিন্নমতসহ সিদ্ধান্ত হয়। এখন মূল আলোচ্য বিষয়—এসব সংস্কার বাস্তবায়নের আইনি ও প্রক্রিয়াগত কাঠামো।
পতাকানিউজ/এনটি

