জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’-এ স্বাক্ষর করেনি। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানেও যায়নি দলটি। ওই সময় বা পরবর্তীতে স্বাক্ষর না করলেও দলটি এখন গণভোট প্রশ্নের ‘হা’ এর পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছে। দলটি ৩০ আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। সেখানে প্রচারণার পাশাপাশি বাকি ২৭০ আসনে প্রচারণার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠেয় এই গণভোটকে কেন্দ্র করে এনসিপির অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সনদে স্বাক্ষর না করা, অন্যদিকে সনদের পক্ষে দেশজুড়ে সংগঠিত প্রচার—এই দ্বৈত অবস্থান কি কৌশলগত, নাকি নীতিগত দ্বিধার বহিঃপ্রকাশ? –প্রশ্ন মূলত এটাই।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নেতৃত্বে সাত মাস ধরে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা শেষে গত বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। শুরুতে ২৪টি দল সনদে সই করে, পরে আরও একটি দল যুক্ত হয়। তবে এনসিপি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল না এবং পরবর্তী সময়েও সনদে স্বাক্ষর করেনি।
যদিও স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগের দিন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছিলেন, পরবর্তীতেও সনদে সই করার সুযোগ থাকবে।
কেন সই করেনি এনসিপি?
সনদে স্বাক্ষর না করার পেছনে এনসিপি তিনটি মূল দাবি তোলে—
১) সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া আগেই প্রকাশ ও প্রধান উপদেষ্টার মাধ্যমে জারি,
২) গণভোটে সনদের পক্ষে রায় এলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কার্যকর না থাকা,
৩) গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার এবং নতুন সংবিধানের নামকরণ ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।
পরবর্তীতে গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করলেও, এনসিপির মতে নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সনদে সই নেই, কিন্তু সর্বব্যাপী প্রচার
এনসিপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে দলটির কৌশল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে তাদের প্রার্থী নেই—এমন ২৭০টি আসনে ‘অ্যাম্বাসেডর’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
দলীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রার্থী থাকুক বা না থাকুক—সারা দেশে গণভোটে একটি সমন্বিত বার্তা পৌঁছানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
কৌশল না দ্বন্দ্ব?
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিনের ভাষ্য, সনদে স্বাক্ষর না করলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারে আইনি বা নীতিগত কোনো বাধা নেই। তাঁর মতে, বাস্তবায়ন আদেশ জারি হলেও সনদের কিছু অস্পষ্টতা এখনো রয়ে গেছে।
অন্যদিকে দলের ভেতরেই ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অনেক নেতা এখন মনে করছেন—গণভোটে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ অবস্থান নেওয়ার পর সনদে স্বাক্ষর না করা রাজনৈতিকভাবে অসংগত হতে পারে। তবে নির্বাচন, গণভোট ও জোট সমঝোতার চাপের কারণে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শর্তসাপেক্ষে সংস্কারের পক্ষে
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা–৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ইতিমধ্যে ‘আজাদী যাত্রা’ কর্মসূচির মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্যে দলটির অবস্থানের সারসংক্ষেপ স্পষ্ট— “সনদের কিছু বিষয় পরিষ্কার নয়, কিন্তু আমরা সংস্কার চাই। তাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আছি।”
এনসিপির বর্তমান অবস্থান কার্যত একটি চাপ ও দরকষাকষির রাজনীতির ইঙ্গিত দেয়। সনদের পক্ষে গণভোটে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সংস্কারপন্থী শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে, আবার স্বাক্ষর ঝুলিয়ে রেখে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার দরজা খোলা রাখছে। প্রশ্ন হলো—গণভোটের ফল ঘোষণার পর এনসিপি কি এই দ্বিধা বজায় রাখতে পারবে, নাকি স্পষ্ট অবস্থান নিতে বাধ্য হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে- এনসিপির ‘হ্যাঁ’ প্রচার আদৌ কৌশল, নাকি একটি অনিবার্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস।
-পতাকানিউজ।

