বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ডিসেম্বর ২০২৫-এ তফশিল ঘোষণার কথা ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা এবং নির্বাচন কমিশনের পরামর্শমতো এটি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ স্থানান্তরিত হয়েছে, যাতে রমজানের আগে নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়। এই নির্বাচনটি শুধুমাত্র একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং গণ-অভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ আওয়ামী লীগের পতন, সংস্কারের দাবি এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জোট গঠনই ফলাফল নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে, কারণ ছোট দলগুলোর ভোটই অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং সাম্প্রতিক অনুসন্ধান থেকে দেখা যায়, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং এবি পার্টির মতো দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের তৎপরতা তীব্র হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে বহুমুখী করে তুলেছে।
বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) এই নির্বাচনের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের পর তার বৃহত্তর জোট গঠনের কৌশল থেকে স্পষ্ট। প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, বিএনপি ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন-এর শরিক দলগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে বাম-ডান, মধ্যম এবং ইসলামপন্থী দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, এই জোটে গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক সকল দলকে স্থান দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিএনপি জামায়াতের সাথে পূর্বের জোট ভেঙে স্বাধীনভাবে ২৩৭টি আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার করছে, যা তার নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তবে, তারা গণতন্ত্র মঞ্চ (জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ইত্যাদি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ১২-দলীয় জোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) এবং চারদলীয় গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের মতো দলগুলোর সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া, ইসলামপন্থী দল যেমন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাথে যোগাযোগ রয়েছে, যাতে আলেম সমাজকে পাশে আনা যায়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশবিমান হলে এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে সূত্র জানিয়েছে। এই কৌশলের মাধ্যমে বিএনপি ছোট দলগুলোর ভোটকে কেন্দ্রীভূত করে বড় আসনে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, যা নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে, এনসিপির সাথে আসন ছাড়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপির জোট আরও বিস্তৃত হয়েছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সংকেত।
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান এই নির্বাচনে জটিলতর হয়ে উঠেছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তার উত্থান থেকে উদ্ভূত। প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ আছে, জামায়াত ইসলামপন্থী সাতটি দল নিয়ে ‘নির্বাচনি সমঝোতা’ গড়ে তুলছে, যা আসনভিত্তিক জরিপের উপর ভিত্তি করে ‘এক আসনে এক প্রার্থী’ নীতি অনুসরণ করবে। আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বলা হয়েছে, এটি কোনো জোট নয়, বরং দেশপ্রেমিক প্রতিশ্রুতিশীল সকল দলের সাথে সমঝোতা, যা আট দল থেকে দশ বা তার বেশি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারও যোগাযোগের ইতিবাচকতা তুলে ধরেছেন।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) জামায়াতের সাথে এই সমঝোতায় যুক্ত, কিন্তু ২০০ আসন ছাড়ের দাবির খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে খারিজ করেছে। আইএবি ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, যা জামায়াতের সাথে সমন্বয় করে ৮ দলের লিয়াজন কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া, খেলাফত মজলিস এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হয়ে তারা সংস্কারের দাবি যেমন জুলাই চার্টারের রেফারেন্ডাম এবং সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরছে। জামায়াতের আমিরের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ায় নতুন নির্বাচনের আয়োজন হবে, যা জোটের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। এই সমঝোতা ইসলামপন্থী ভোটকে একত্রিত করে বিএনপির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, তবে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার পর তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের ইঙ্গিত দেয়।
এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এবং এবি পার্টির (আমার বাংলাদেশ পার্টি) নেতৃত্বাধীন নতুন জোট গঠনের খবর এই নির্বাচনের একটি উজ্জ্বল দিক, যা গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থানকে প্রতিফলিত করে। প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, এনসিপি এবং এবি পার্টি সহ সাতটি দল নতুন জোট গঠন করতে যাচ্ছে, যাতে গণঅধিকার পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এবং আপ বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবের বক্তব্যে জোটের পরিবর্তে সংস্কার-কেন্দ্রিক অ্যালায়েন্সের কথা বলা হয়েছে, যখন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু আলোচনার অগ্রগতি ঘোষণা করেছেন।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধান অনুসারে, ২৩ নভেম্বর ২০২৫-এ মঞ্জু ফেনীতে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনায় জানিয়েছেন, এই জোট কয়েক দিনের মধ্যে গঠিত হবে এবং ২৫ নভেম্বর জাতীয় প্রেস কনফারেন্সে ঘোষণা করা হবে। এতে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির দলগুলো যুক্ত হবে, কিন্তু বিএনপির সাথে জোট করা হয়নি—বিএনপিকে তারা প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে স্বাধীনভাবে এগিয়ে যেতে দিয়েছে। এই জোটের মূল ফোকাস নতুন সংবিধান এবং ইসলামপন্থীদের সাথে অ্যালায়েন্স প্রত্যাখ্যান, যা তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করতে পারে। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কিছু সময় লাগবে, কিন্তু এটি ২৭ নভেম্বরের আগে ঘোষিত হতে পারে। এই জোট নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে, বিশেষ করে যেখানে ছোট দলগুলোর ভোট বিএনপি বা জামায়াতের ফলাফল নির্ধারণ করবে।
বাম ঘরানার দলগুলোর মধ্যেও জোট গঠনের তৎপরতা লক্ষণীয়, যা প্রদত্ত তথ্যে ‘যুক্তফ্রন্টের আদলে’ বামপন্থী দলের সমন্বয় হিসেবে উল্লেখিত। ছয়টি বাম দল নিয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোট—যেমন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ইত্যাদি—শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদের সাথে বৃহত্তর জোট গড়ার চেষ্টায় রয়েছে। এছাড়া, দলিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগঠন, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, ঐক্য ন্যাপ, জাতীয় গণফ্রন্ট এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার (বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, বাসদ-মাহবুব ইত্যাদি) সাথে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, এই জোটগুলো সংস্কার এবং সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে গঠিত হচ্ছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধরে রাখার প্রয়াস। এই সমন্বয় বামপন্থী ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করে শহুরে এবং শ্রমিক আসনে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে বিএনপির বৃহৎ জোটের সামনে তাদের চ্যালেঞ্জ বড়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই জোট সমীকরণকে নির্বাচনের মূল নির্ধারক হিসেবে দেখছেন, যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, বিএনপি-কেন্দ্রিক উদার গণতান্ত্রিক জোট, জামায়াতের আসন সমঝোতা এবং এনসিপি-সহ পৃথক জোটগুলো গঠিত হবে। তিনি যুক্তি দেন, নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের কারণে বড় দলগুলো আসন ছাড়ে সতর্কতার সাথে এগোবে, যা জোট গঠনকে বিলম্বিত করতে পারে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে নির্বাচন কমিশনের সাথে দলগুলোর সংলাপ (জামায়াত ১৯ নভেম্বর, বিএনপি পরদিন) এবং ১২৭.৬১ মিলিয়ন ভোটারের তালিকা প্রকাশ নির্বাচনের প্রস্তুতি নির্দেশ করে। উপসংহারে বলা যায়, এই জোটগুলো দেশের রাজনীতিকে বহুলায়িত করলেও, সংস্কারের অভাবে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতা এবং জাতীয় নেতাদের ঐক্যই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
পতাকানিউজ/এনটি

