জ্বালানি সংকটের মুখে বিশ্বকে ঠেলে দিয়ে এখন ইরান অভিযানের লক্ষ্য অর্জনের কথা বলে মুখে ফণা তুলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বললেও ইরান যুদ্ধ বন্ধে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা আমেরিকানদের সামনে তুলে ধরেননি প্রেসিডেন্ট।
ফলাফল পাওয়া গেল হাতেনাতেই। এই বণিক প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর বিশ্ববাজারে আরেক দফা বাড়লো তেলের দাম। এখন সংকট এমন পর্যায়ে গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও মুহূর্তেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারছে না। আবার ইরানও যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে কথা বলছে না।
যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি হবেই। এটা মেনে বলা যায়, ইরানের ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। শিশু, নারী ও বেসরকারি মানুষের লাশের সারি সেখানে দীর্ঘ হচ্ছে। সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের দোসর ইসরায়েলে মানুষের মৃত্যু নেহায়েত কম।
এই তো গেল, যুদ্ধের ফিরিস্তি। যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বলা যাক। শুধু জ্বালানি তেল নিয়েই যদি বলি, বিশ্ব এখন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে জ্বালানি নিয়ে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব এমন সংকট অতীতে দেখেনি। যদিও ১৯৭০ সালেও বড় ধরনের তেল সংকট হয়েছিল। কিন্তু এবার হয়ত সেই সংকটকেও ছাড়িয়ে যাবে- এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন আশঙ্কার বাস্তবতা দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগের মধ্যেই। হরমুজ প্রণালি খুলতে ৪০ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের নিয়ে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেছে যুক্তরাজ্য। বিষ্ময়কর বিষয় হলো, এখানে যুক্তরাষ্ট্র নেই! এটা বৃটিশদের কৌশলী কর্ম, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিরক্ত হয়েই এমন উদ্যোগ-তাৎক্ষণিক বোঝা গেল না বটে। তবে শঙ্কা যে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন বণিক ট্রাম্প-এটা তো নিশ্চিত হওয়া গেল।
অবশ্য জ্বালানি সংকটের মুখে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ফিলিপাইনস। ওই দেশে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সেদেশে এখন সরকারি উদ্যোগে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেদেশের সরকার মনে করছে, পরিকল্পিত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করা যাবে।

শুরুটা ফিলিপাইনস হলেও পরে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশ অস্ট্রেলিয়ার নাম। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দেশটি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং জ্বালানি খরচ কমানোর চেষ্টা করছে।
একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ যেন নিশ্চিত থাকে, সেই ব্যবস্থা করতে ২০২২ সালের জ্বালানি নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করছে। ওই নীতিমালায় তেলের মূল্যসীমা নির্ধারণ, কর ও ট্যাক্স ছাড় ও জ্বালানি সংক্ষরণের মতো বিষয়গুলো রয়েছে।
এবার পাশ্চাত্যের দেশ থেকে এশিয়ায় নজর দেওয়া যাক। দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতও সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় বসে নেই বাংলাদেশও। বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পরই যুদ্ধের দামামার মধ্যে পড়ে গেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই সপ্তাহ পার হতে না হতেই মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ফলাফল বাংলাদেশের জন্য করুণ হয়ে উঠে। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ তেল-গ্যাস। সেখানেই আঘাত যেন বাংলাদেশের ওপরই আঘাত!
কী সাংঘাতিক বিষয়! বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকারও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর বাংলাদেশের অনেক মানুষ তেল মজুদে যেন মনোযোগ দিয়েছে!
পাশের দেশ মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কাও শুরু করেছে জ্বালানি রেশনিং। উপায় নেই। বাধ্য হয়ে প্রায় সব দেশকেই একই পথে হাঁটতে হবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য জ্বালিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছে।

কী হতে পারে ভবিষ্যতে
যুদ্ধে কোন দেশ হারলো-জিতলো সেটা বড় নয়। বড় হচ্ছে পুরো বিশ্বই যেন বিপাকে পড়েছে যুদ্ধের কারণে। ইরানে মানুষ মরছে, সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। ইরানের পাল্টা আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে।
এসব কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানিখাত। ফলে পরিস্থিতি যে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ। এর আগে যেসব জ্বালানীবাহী জাহাজ ইউরোপ কিংবা এশিয়ামুখী ছিল সেগুলো এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে বা যাচ্ছে। সব দেশেই কিছু দিনের জ্বালানি মজুদ থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাইপলাইনে থাকা জ্বালানি।
এখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ লাইন বন্ধ। তাহলে উপায় কী?
যুদ্ধ শুরুর পরপরই জ্বালানি তেলের ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার দাম ছাড়িয়েছিল। এখন সেটা ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, কিংবা ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছেন খোদ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল। তাঁর ভাষ্য, হাল সময়ের জ্বালানি সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। জ্বালানি নিরাপত্তা অতীতে কখনোই এতোটা প্রকট হয়নি। ১৯৭০ সালে জ্বালানি সংকট হয়েছিল। এবার তার চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ বলে মনে করছেন ফাতিহ।
আবার এই সংকটকে কোভিড মহামারি কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি বলা হচ্ছে। এই যুদ্ধে তেল ও গ্যাস বাণিজ্য বৃহৎ পরিসরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা দ্রুত পূরণের সুযোগ সীমিত। এর ফলে গ্যাস-তেলের দাম বাড়বে।
অন্যদিকে ভারত এবং ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশ জ্বালানির পরিবর্তে কয়লা পোড়ানো শুরু করবে। যা পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংকট মোকাবেলায় কি হতে পারে বিকল্প
তেল ও গ্যাসের চরম সংকট হলে তা মোকাবেলায় সাময়িক কিছু বিকল্প হাতের নাগালে আছে। তবে তা স্থায়ী কিছু নয়। একেবারেই সাময়িক। যেমন সৌরপ্যানেল, বায়ুচালিত টারবাইন ও বৈদ্যুতিক ব্যাটারি। বাজারে এগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু তা দিয়ে চাহিদা মেটানো সহজ নয়।
জ্বালানির বিকল্প হবে এমন কিছু প্রযুক্তির প্রতি মানুষ ঝুঁকবে প্রয়োজনের স্বার্থেই। যেমন ইতোমধ্যেই ফিলিপাইনের মানুষ খুঁজছেন চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি।
আবার জার্মানির সৌর প্যানেলের চাহিদা বেড়েছে আকষ্মিকভাবে। কারণ, মানুষ জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরপ্যানেল ব্যবহারকে সুবিধাজনক বা সাময়িক বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। একইভাবে ব্রিটেনে বাড়ছে হিট পাম্পের চাহিদা। ভারতে রান্নার জন্য ইনডাকশনের চাহিদা বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের এমন বিকল্প ভাবনার মধ্যেই ভিয়েতনামের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার চিন্তা করছে। কারণ, ভবিষ্যতে গ্যাস সংকট হলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র অকাজের হয়ে পড়তে পারে। ওই শিল্পগোষ্ঠী এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে চাইছে।
এমন বিকল্প ভাবনার মধ্যে তাৎক্ষণিক লাভের মুখে দেখেছে চীন। দেশটির বড় তিনটি ব্যাটারি কোম্পানির বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। যা অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার।
পাকিস্তান হতে পারে মডেল
পরিবেশবান্ধব জ্বালানির জন্য যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান হয়ে উঠতে পারে মডেল। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পাকিস্তান সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট পার করেছে। ওই সময় আকষ্মিকভাবে অত্যধিক হারে গ্যাসের মূল্য বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশটি গ্যাস কিনতে পারেনি।
পর চীনের সৌর প্যানেল পাকিস্তানের জ্বালানি ব্যবস্থা যেন বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ, সংকট বিকল্পই হয়েছিল পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। ওই সময় এক ধাক্কায় পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নিত হয়। যা সংকটের আগে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।
গ্যাসের কি অবস্থা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনে হামলা চালায়। সেই ধারাবাহিকতায় কাতারের রাস লাফান এলএনজি রপ্তানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে। এতে এলএনজির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আকষ্মিকভাবে বিশ্ববাজারে অন্তত ২০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে। এখন বলা হচ্ছে, কাতারের ওই গ্যাসক্ষেত্র পুনরায় উৎপাদনে যেতে অন্তত ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।
যুদ্ধের কারণে আবর দেশগুলো তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের পরও পুনরায় আগের মতো তেল উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে। কারণ, তেল উৎপাদন একবার কমালে পুনরায় বাড়াতে সময় লাগে। হুট করে বাড়ানো যায় না। এটা প্রক্রিয়াগত বিষয়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকবে অনেক দিন।

যা করতে পারে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ অতীতে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এগুলো এই সংকটকালে কাজে আসবে না। জ্বালানি তেলের অভাবে সেগুলো অলস বসে থাকবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ অনুকরণীয় শিক্ষা নিতে পারে পাকিস্তান থেকে। সেই দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় চীনের তৈরি সৌরপ্যানেলের ব্যবহার বাড়িয়েছিল। বাংলাদেশকেও এখন হয়তো সেই পদে দ্রুত হাঁটতে হবে। এছাড়া রেশনিং ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশ আছেন, যারা তেল মজুদ করতে পছন্দ করছেন। এতে সংকট ঘণীভূত হচ্ছে। জ্বালানি নীতি বাস্তবায়ন করে এটা কমাতে হবে। রাশিয়া থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে হলে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়ে সেটা আদায় করে নিতে হবে সরকারকে।
পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ওই ধরনের গাড়ির আমদানি সহজ বা শুল্কহার কমানো যেতে পারে।
জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে আনতে চীনকে অনুকরণীয় ধরে যদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে হয়তো বাংলাদেশ ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ভালো সমাধান পাবে। কিন্তু এটা দ্রুত হওয়ার নয়। সময়সাপেক্ষে বিষয়। সেই পর্যন্তই বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্য দেশের মতো জ্বালানিনীতি বাস্তবায়ন করে চলতে হবে। এর বিকল্প আপাতত খোলা নেই।
এস এম রানা, নির্বাহী সম্পাদক, পতাকানিউজ।

