কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম অন্য ইউনিয়নের আওতায় নেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি ও জনমত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইউনিয়ন সীমানা পুনর্নির্ধারণের সম্ভাব্য উদ্যোগ ঘিরে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই পক্ষ।
ইতোমধ্যে এলাকায় মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিল ও পাল্টাপাল্টি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বারো আউলিয়া নগরসহ কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামকে লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব। বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই কাকারা ইউনিয়নের একাংশ এর তীব্র বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের একটি পক্ষ এই অন্তর্ভুক্তিকে উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে। ফলে একই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যেই মতবিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।
এ ইস্যুতে লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মানিক এবং কাকারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন পৃথক অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে কাকারা ইউনিয়নের নেতাকর্মী, সমর্থক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বারো আউলিয়া নগরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এতে মঈনুর রশিদ শামীমসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বৃহত্তর কাকারা ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই কয়েক দফা খণ্ডিত হয়েছে। বমুবিলছড়ি ও সুরাজপুর-মানিকপুর নামে নতুন ইউনিয়ন গঠন এবং একটি বড় পৌরসভার সঙ্গে অংশবিশেষ যুক্ত হওয়ার ফলে ইউনিয়নের আয়তন ও প্রশাসনিক কাঠামো আগেই সংকুচিত হয়েছে। তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে আবারও বারো আউলিয়া নগর, মুসলিম পাড়া, শাহ্ উমরনগর ও প্যাচামারা এলাকাকে লক্ষ্যারচরের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে, যা স্থানীয় জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
এর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে কাকারা ইউনিয়নকে দ্বিখণ্ডিত না করার দাবিতে একটি প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একইদিন বিকেলে নূর মোহাম্মদ মানিকের নেতৃত্বে পাল্টা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বারো আউলিয়া নগরসহ পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি গ্রামগুলো লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নূর মোহাম্মদ মানিক বলেন, বারো আউলিয়া নগর এলাকায় লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক ভোটার বসবাস করেন। তার ইউনিয়নের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা কম হওয়ায় প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য দুটি ওয়ার্ড একীভূত করে বারো আউলিয়া নগরকে পৃথক ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, পাহাড়ি এলাকাগুলোর বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। লক্ষ্যারচরের সঙ্গে যুক্ত করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হবে।

দুইপক্ষ পাল্টাপাল্টি দাবি করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট পাহাড়ি গ্রামগুলোতে প্রায় ১২০০ ভোটার রয়েছে এবং সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের সমীকরণে সুবিধা নিতেই দুই পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত ওসমান দাবি করেছেন, বারো আউলিয়া নগরসহ পাহাড়ি এলাকায় ইতোমধ্যে সড়ক নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ধর্মীয় স্থাপনা উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং নাগরিক সুবিধা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। অপর সাবেক চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন কাকারাকে পুনরায় খণ্ডিত করার উদ্যোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে চকরিয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, এলাকাবাসীকে উন্নয়নের নামে অন্য ইউনিয়নে নেওয়ার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—জনস্বার্থ, নাকি পাহাড় ও প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের সুযোগ তৈরি করা।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠার পর সতর্ক অবস্থান নিয়ে প্রশাসন। চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। স্থানীয় দুই পক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে পুলিশ নজরদারি জোরদার করেছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, ইউনিয়নের সীমানা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্থানীয় প্রশাসনের নয়; এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনগণের মতামত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা।
উল্লেখ্য, পাহাড়ি গ্রামগুলোর অধিকাংশ বসতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৮৭ সাল থেকে ধীরে ধীরে বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা ও টিলা সমান করে বসতি স্থাপন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এসব বসতি বিস্তৃত হয়ে বর্তমানে একাধিক গ্রামে রূপ নিয়েছে। আর সেই জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েই এখন চকরিয়ার কাকারা অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
-পতাকানিউজ/এমজেসি

