চট্টগ্রামে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে চিকুনগুনিয়া এখন আর কেবল সাময়িক জ্বরের রোগ নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম কারণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত গবেষণায়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ARF)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণার শিরোনাম ছিল— ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের সার্বিক পরিস্থিতি, জনস্বাস্থ্যে প্রভাব, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ভাইরাসের জিনোমের স্বরূপ উন্মোচন’।
ছয় মাসব্যাপী গবেষণা, বহু প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
গত জুন থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের উপজেলার রোগীদের ক্লিনিক্যাল, জনস্বাস্থ্য, রোগতাত্ত্বিক ও জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অংশ নেয় এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএসটিসি, এপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ, এবং নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ, সিকুয়েন্সিং এন্ড ইনোভেশন ল্যাব চিটাগং (এনরিচ)সহ দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
চিকুনগুনিয়া: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ
গবেষণায় উঠে এসেছে, চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়া দ্রুত বিস্তারমান একটি মশাবাহিত ভাইরাসে পরিণত হয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের বড় অংশের ক্ষেত্রে জ্বর সেরে যাওয়ার পরও তিন মাসের বেশি সময় ধরে অস্থিসন্ধির তীব্র ব্যথা স্থায়ী হয়েছে—যার হার প্রায় ৬০ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা যায়— ডেঙ্গুর সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার সহ-সংক্রমণ: ১০%। জিকার সঙ্গে সহ-সংক্রমণ: ১.১%। ভুল রোগ নির্ণয় ও অপর্যাপ্ত রিপোর্টিং: প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে প্রকৃত রোগের বোঝা অজানা। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসের অধিক স্থায়ী হয় (৬০%)। ভুল রোগ নির্ণয় এবং পর্যাপ্ত রিপোর্ট না হওয়ার কারণে প্রকৃত রোগের বোঝা অনেকাংশেই অজানা থেকে যাচ্ছে (৩০%)। পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ (গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা) রোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে কোতোয়ালী, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। উপজেলা পর্যায়ে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় চিকুনগুনিয়া জিনোম গবেষণা
১,১০০ রোগীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণাটি দেশে এ পর্যন্ত চিকুনগুনিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় ক্লিনিক্যাল ও জিনগত বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষকরা মনে করছেন, চিকুনগুনিয়া এখন আর কেবল একটি সাময়িক জ্বরের রোগ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র ডেঙ্গুকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে এই রোগ মোকাবিলা যথেষ্ট নয় বলে গবেষণায় মত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট ১,৭৯৭ জন রোগীর ক্লিনিকাল এবং বায়োলজিক্যাল ডেটা নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশ সতর্কতামূলক লক্ষণসহ ডেঙ্গুতে ভুগছিলেন, যার হার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি (৪৪.৮%)। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।
ক্লিনিক্যাল উপসর্গ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব রোগীরই জ্বর ছিল (৯৮.৯%)। পাশাপাশি বমিভাব ও বমি (৭১.৪%), মাথাব্যথা (৬২.৫%), মাংসপেশি (৪২.৪%) ও চোখের পেছনে ব্যথা (৩৯.৭%), পেটব্যথা (৩৫.৮%) এবং ডায়রিয়া (২৩%) এর মতো উপসর্গ উল্লেখযোগ্য হারে উপস্থিত ছিল।
জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী (৪৮.৪%)। শিশু-কিশোর যাদের বয়স ১৮ এর নিচে (২৪.৫%) এবং মধ্যবয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্য (২২%)। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে পুরুষ রোগীর সংখ্যা নারীদের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে (৫৫.৯%)। বসবাসের দিক থেকে শহরাঞ্চলের মানুষ (৬২%) গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।
সহ-রোগেও সর্তকতা
সহ-রোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান ছিল উচ্চ রক্তচাপ (৫.৫%) এবং ডায়াবেটিস (৪.৫%)। এছাড়া মূত্রনালির সংক্রমণসহ অন্যান্য সহ-সংক্রমণও একটি অংশে পাওয়া গেছে (৩% এর মতো)। ডেঙ্গুজনিত জটিলতার মধ্যে কাশি (৩১%) এবং রক্তক্ষরণ (২৩.৯%) সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। কিছু রোগীর শরীরে তরল জমে যাওয়ার লক্ষণও পাওয়া গেছে (পেটে পানি জমা ১৪.৩%; ফুসফুসে পানি জমা ১৪.২%)। রক্ত পরীক্ষার ফলাফলে অধিকাংশ রোগীর শরীরে তীব্র সংক্রমণের সূচক শনাক্ত হয়েছে (৭২.৭%), যা সাম্প্রতিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। সংক্ষেপে, গবেষণার সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডেঙ্গু সংক্রমণ মূলত তরুণ, শহরাঞ্চলের পুরুষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে। জ্বর ও পরিপাকতন্ত্রজনিত উপসর্গ ছিল প্রধান লক্ষণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে ছিল, যেখানে গুরুতর জটিলতা কম দেখা গেছে।

জিনোম সিকুয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে, চট্টগ্রামে পাওয়া চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের ধরনটি আগে পাকিস্তান, ভারত ও থাইল্যান্ডে শনাক্ত হওয়া ভেরিয়েন্টের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে এতে অর্ধশতাধিক জিনগত পরিবর্তন (মিউটেশন) পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা চলমান রয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, ‘শুধুমাত্র ডেঙ্গুকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে চিকুনগুনিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়।’
ডেঙ্গু : তরুণ ও শহরাঞ্চলের পুরুষরা বেশি আক্রান্ত
ডেঙ্গু সংক্রান্ত অংশে ১,৭৯৭ জন রোগীর ক্লিনিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়— সতর্কতামূলক লক্ষণসহ ডেঙ্গু: ৪৪.৮%।
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। প্রধান উপসর্গগুলো ছিল— জ্বর: ৯৮.৯%। বমিভাব ও বমি: ৭১.৪%। মাথাব্যথা: ৬২.৫%। মাংসপেশির ব্যথা: ৪২.৪%। চোখের পেছনে ব্যথা: ৩৯.৭%। পেটব্যথা: ৩৫.৮%। ডায়রিয়া: ২৩%
কারা বেশি ঝুঁকিতে
জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে— ১৮–৩৫ বছর বয়সী তরুণ: ৪৮.৪%। ১৮ বছরের নিচে: ২৪.৫%। মধ্যবয়সী প্রাপ্তবয়স্ক: ২২%। পুরুষ: ৫৫.৯%। শহরাঞ্চলের বাসিন্দা: ৬২%। সহ-রোগ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে— উচ্চ রক্তচাপ: ৫.৫%। ডায়াবেটিস: ৪.৫%। ডেঙ্গুজনিত জটিলতার মধ্যে কাশি (৩১%) ও রক্তক্ষরণ (২৩.৯%) উল্লেখযোগ্য। কিছু রোগীর শরীরে পেটে ও ফুসফুসে পানি জমার লক্ষণও পাওয়া গেছে।
গবেষণার নেতৃত্ব ও সহযোগিতা
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, রেলওয়ে হাসপাতালের ডা. আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ নুরুদ্দিন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান।
গবেষক দলে আরও ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডাঃ এম এ সাত্তার, ডাঃ মারুফুল কাদের, ডাঃ নুর মোহাম্মদ, ডাঃ হিরন্ময় দত্ত, ডাঃ ইশতিয়াক আহমদ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডাঃ এ এস এম লুতফুল কবির শিমুল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডাঃ রজত বিশ্বাস, ইউএসটিসির আইএএইচএস এর ডাঃ আয়েশা আহমেদ, এপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ডাঃ মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ অরিন্দম সিং পুলক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের ডঃ মোঃ মাহবুব হাসান ও মহব্বত হোসেন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ এএমএএম জুনায়েদ সিদ্দিকি।
সহযোগিতায় ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
গবেষণার সার্বিক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—চট্টগ্রামে মশাবাহিত রোগের ধরন বদলে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া এখন দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত নজরদারি, উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং বহুমুখী প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণ ছাড়া ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
পতাকানিউজ/কেএস

