ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। কিন্তু বাড়ি থেকে রাজধানীমুখী এই যাত্রা যেন পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘ দুর্ভোগে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, বাসের টিকিট সংকট ও অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়েছেন হাজারো মানুষ। নিরাপদ পরিবহন না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপে করে ঢাকার পথে রওনা হচ্ছেন।
শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে বগুড়ার বনানী মোড়সহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায়, ঢাকাগামী যাত্রীদের ঢল নেমেছে। বাস না পেয়ে যে যেভাবে পারছেন রাজধানীর উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। আর এই সুযোগে কিছু পরিবহন মালিক ও চালক ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকগুণ পর্যন্ত।
দ্বিগুণের বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
ঢাকাগামী যাত্রী আলমাস আলম ও জাহিদ হোসেন অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপকে পুঁজি করে পরিবহন শ্রমিকরা দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া নিচ্ছেন। যেখানে সাধারণ সময়ে বগুড়া-ঢাকা রুটে ভাড়া ৪০০ টাকা, সেখানে এখন সিটপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এমনকি দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীদের কাছ থেকেও ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাস না পেয়ে ট্রাক ও পিকআপে যাত্রা করা যাত্রীদের কাছ থেকেও জনপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যাত্রী হালিমা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা থেকে বাড়ি আসার সময় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েছি, এখন আবার ঢাকায় ফিরতেও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে আনা জরুরি।’
‘ঢাকা থেকে বাড়ি আসার সময় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েছি, এখন আবার ঢাকায় ফিরতেও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে আনা জরুরি।’
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে যাত্রা
বগুড়ার নন্দীগ্রাম থেকে আসা পোশাকশ্রমিক শামীম আহমেদ জানান, আগামী রোববার থেকেই তাকে কারখানায় কাজে যোগ দিতে হবে। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই ট্রাকে করে ঢাকার পথে যাত্রা করছেন তিনি। ট্রাকে যেতে তাকে ৪০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।
একটি পণ্যবাহী ট্রাকের সহকারী হায়পত আলী বলেন, ‘ঈদের পর শ্রমিকদের ঢাকায় ফেরার সময় বাসের সংকট হয়। তাই প্রতি বছরই আমরা ট্রাকে করে শ্রমিকদের নিয়ে যাই। একটি ট্রাকে প্রায় ৭০ জন পর্যন্ত ওঠে।’
টার্মিনালে অপেক্ষা হাজারো শ্রমিক
শনিবার বগুড়ার ঠনঠনিয়া কোচ টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ পোশাকশ্রমিকসহ বিভিন্ন উপজেলার মানুষ বাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন। সারিয়াকান্দি ও নন্দীগ্রামসহ আশপাশের অন্তত ছয়টি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ঢাকার পোশাক কারখানায় কর্মরত। প্রতি বছর ঈদের পর পর্যাপ্ত বাস না থাকায় তাদের একই দুর্ভোগে পড়তে হয়।
তহমিনা খাতুন ও লিয়াকত আলী বলেন, ‘বাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রাকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এটি অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিকল্প না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ট্রাকে উঠতে হচ্ছে।’

কাউন্টারে নেই টিকিট
ঢাকার কোচ টার্মিনালের এস আর ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহন ও হানিফ পরিবহনসহ একাধিক বাস কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের কাউন্টারে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
বগুড়া জেলা বাস মিনিবাস ও কোচ পরিবহন মালিক সমিতির শেরপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা জানান, ঈদের পর পোশাকশ্রমিকদের ঢাকায় নেওয়ার জন্য আঞ্চলিক সড়কের শতাধিক বাস ব্যবহার করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে শেরপুর থেকে অন্তত ৫০টি বাস ঢাকায় গেলেও যমুনা সেতু থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত যানজটে আটকে পড়ে। ফলে বাসগুলো রাতে ফিরতে পারেনি, এতে টার্মিনালে বাস সংকট আরও বেড়েছে।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক নূর হোসেন বলেন, ট্রাকের পেছনে শ্রমিকদের না উঠতে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। তবুও অনেকেই কথা শুনছেন না। শ্রমিক পরিবহনে ট্রাক ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার এই যাত্রা প্রতি বছরই শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপদ ও পর্যাপ্ত গণপরিবহন নিশ্চিত না হলে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
-পতাকানিউজ/পিএম

