এশিয়ার বৃহত্তম বার ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ সালের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল। নির্বাচনে দুটি প্যানেল অংশ নিচ্ছে। একটি হচ্ছে বিএনপির সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল) ও অন্যটি হচ্ছে জামায়াত ও এনসিপি সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ প্যানেল (সবুজ প্যানেল)।
সরকারি দল বিএনপি সমর্থিত প্যানেল নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে এবং বিভিন্ন ধরনের কারচুপি করতে পারে এ আশঙ্কা করছে জামায়াত ও এনসিপি সমর্থিত প্যানেল। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। এর আগে সব সময়ই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে জামায়াত ও বিএনপি এক হয়ে প্যানেল দিয়ে নির্বাচন করত। এবার পৃথক প্যানেলে নির্বাচনে একে অপরের মুখোমুখি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তারা।
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সবুজ প্যানেলের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে বক্তারা বিভিন্ন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
অপরদিকে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সেই আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দেন। তারা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
জামায়াত-এনসিপি প্যানেল পরিচিতি
পুরোনো ঢাকার আদালতের পাশে স্টার কাবাবে অনুষ্ঠিত হয় জামায়াত-এনসিপি প্যানেল পরিচিতি। এ পরিচিতি অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতা ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আপনাদের (বিএনপি) পাশে এমন কেউ নেই, আপনারা ভালোই করেই জানেন। জনগণ আন্দোলন করে ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারকে সরিয়েছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না।’
তিনি বলেন, ‘সরকার দুমাসের মধ্যে জনগণকে রাজপথে আসতে বাধ্য করছে। যে ইস্যু সংসদে সমাধান হওয়া উচিত, সেটিকে রাজপথে আনা উচিত নয়। ফলাফলে কারচুপি করে আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন এটা আপনারাও জানেন, জনগণও জানে। গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করবেন না।’
অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী ২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘দুই মাসে লক্ষ্য করেছি, সরকার পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দলীয়করণ করছে এবং নব্য ফ্যাসিবাদকে স্থানান্তর করছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের পরে এই বাংলাদেশ অতীতে কখনো কল্পনা করা যায়নি। যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই হয়েছিল, সেটি নিছক ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনের জন্য ছিল না; বাংলাদেশকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্যই জুলাই হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে বিচারকরা এক্সিকিউটিভের কাছে মাথা নত করবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পরিবর্তিত বিচার ব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও আদেশ দিতে দ্বিধাবোধ করবেন না। এমন বিচারালয় না হলে আমাদের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার স্বপ্ন ব্যর্থ হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হলে এবং আইনজীবীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য না হলে সমাজের মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুডিশিয়ারিকে রক্ষা করতে না পারলে টু-থার্ড মেজরিটির জোরে সংবিধানকে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা হবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘জনগণ জিম্মিদশা ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় তাদের ভোটটা রক্ষা হোক।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা বা যেকোনো কারণে আমরা ভোট রক্ষা করতে পারিনি। উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কারচুপি হলে ভোট হবে না, কিন্তু ভোটকেন্দ্র ছাড়া যাবে না। আমরা প্রয়োজনে আপনাদের পাশে এসে দাঁড়াব, আপনাদের সাহস দেব, কিন্তু ভোট বর্জন করা যাবে না।’
ল’ইয়ার্স ফোরামের সভাপতি মতিউর রহমান আকন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির পর এ প্রথম ঢাকা বারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভূতপূর্ব খেলা হয়েছে। সরকার গঠনের পর তারা অগণতান্ত্রিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ঢাকা বারের নির্বাচন কমিশন যেভাবে গঠন হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি। এখানেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে।’
এছাড়া অন্যান্য আইনজীবী বক্তারাও ঢাকা বারের নির্বাচন অবাধ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা বার ইউনিটের সভাপতি ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আবু বাক্কার সিদ্দিক।
প্রসঙ্গত, প্যানেল পরিচিতি সভায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে দুপুরের দিকে সারজিস আলম আদালত এলাকায় যান। তিনি প্রার্থীদের ও সমর্থকদের নিয়ে আদালত এলাকায় মিছিল করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময়
ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ কার্যবর্ষের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবার বিষয়ে আশ্বাস প্রদান করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. বোরহান উদ্দিন। কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ঢাকার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে সব জায়গায় নির্বাচনে হলেও ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এ নির্বাচন আইনজীবীদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে দুটি দলের মধ্যে নির্বাচন হতো। একটি আওয়ামীলীগ এবং আরেকটি বিএনপি। কিন্তু এবার আওয়ামীলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এবারের বিএনপি এবং জামায়াত ও স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করবেন অনেকে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন স্বচ্ছ হবে। ভোটাররা কোন প্রকার বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পারবেন এবং গণনা স্বচ্ছতার সঙ্গেই হবে।’
নির্বাচন কমিশনে জামায়াতের পক্ষে কম সদস্য রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বারের সংবিধানে ১০ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। তবে এখানে কোন দল থেকে কত জন থাকবে তা বলা নেই।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। কিন্তু কোন ব্যক্তির প্রতি নিষেধাজ্ঞা নেই। কাজেই ঢাকা আইনজীবী সমিতির সব সদস্যই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। কেউ কোন বাধার সৃষ্টি করবে না।’
এতে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনিসুর রহমান, খন্দকার মো. ফেরদাউস,মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ, রায়হান মোর্শেদ, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. ওয়ালিউল ইসলাম (তুষার), মো. আফানুর রহমান (রুবেল), মো. আ. মালেক, মো. জাহেদুল আলম মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া কোর্ট রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি জাকারিয়া হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ এসোসিয়েনের অন্যান্য সদস্যরা।
প্রসঙ্গত, আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল দুই দিন ব্যাপী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ভোটগননা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এবারের নির্বাচনে সম্পাদকীয় পদে ১৩ জন সহ কার্যকরী সদস্য পদে ১০ জন সহ মোট ২৩টি পদের অনুকূলে ৫৪ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সমর্থিত নীল প্যানেল ও জামাত সমর্থিত সবুজ প্যানেলের ২৩ জন করে মোট ৪৬ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৮ জন বিভিন্ন পদে নমিনেশন বৈধ হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ও সমমনা সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কালাম খানে নেতৃত্বে নীল প্যানেল। জামায়াত ও এনসিপি সমর্থিত সভাপতি এস এম কামাল উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে সবুজ প্যানেল। এছাড়া সভাপতি পদে মো. ইউনুস আলী বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও বলাই চন্দ্র দেবসহ বিভিন্ন পদে ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
পতাকানিউজ/এএ/আরবি

