পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মানদীর নৌ চ্যানেলের ইজারা দ্বন্দ্বের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২ যুবক। এ ঘটনার প্রতিবাদে ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবন সংকটে থাকা দুই যুবকের পরিবার ও স্বজনরা অঝোরে কেঁদেছেন।
বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর সকালে উপজেলার সাড়াঘাট ক্যানেলপাড়া এলাকায় নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। গুলিবিদ্ধরা হলেন ওই এলাকার মো. হোসেন গাজীর ছেলে মো. নিজাম (২৬) এবং বাবলু হওলাদারের ছেলে মো. সজীব হাওলাদার (২৫)।

অতর্কিত গুলিবর্ষণে প্রশাসনের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে মানববন্ধনে আহতদের স্বজনরা বলেন, পদ্মা নদীর সাঁড়াঘাট এলাকায় নৌ চ্যানেল নেই। অবৈধভাবে ইজারা আদায় করছে গ্রুপঅন সার্ভিসেস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সোহেল খন্দকারের লোকজন। অথচ সাঁড়ার রানাকড়িয়া তড়িয়া মহলের খাজনা আদায়ে বৈধতা থাকা সত্ত্বেও এটি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসানের লোকজনকে খাজনা আদায় করতে বাধা দিয়ে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটায় খন্দকার সোহেলের পক্ষের লোকজন। এতে পদ্মানদী পাড়ের বাসিন্দা দুই যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দুয়ারে রয়েছে।
মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ সজিবের দাদি মোছা. রিজিয়া খাতুন অবিরাম কান্না ও বিলাপ করে বলেন, ‘তাগো গুলি লাইগ্গা আমার নাতি হাসপাতালে ভর্তি। কি দোষ করছিলাম আমরা, কির লাইগ্গা হেগো পাড়ায় আইয়া বাড়ি করছিল্যাম। গরিবদের উপর তাগো এত অত্যাচার কির লাইগ্গা? আমার নাতিডার উপর গুলি করবার বিচাই চামু কার কাছে।’
বুকে গুলি লাগা যুবক নিজামের মা কান্না ও বিলাপ করে বলেন, ‘আমার ছেলে তো তাদের কোন ক্ষতি করে নাই। তবে তারা কেন গুলি করলো? আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের উপর এত নির্যাতন কেন। এ ঘটনার বিচাই দাবি করছি প্রশাসনের কাছে।’
মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, শুধুমাত্র প্রশাসনের অবহেলা আর ব্যর্থতার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এ দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারেনা। নতুন ইউএনও মনিরুজ্জামান কুষ্টিয়ার বাসিন্দা বলে হয়তো তাদের পক্ষে কাজ করছে। আমরা তার অপসারণ দাবি করছি এবং জনগণের পক্ষে কাজ করার মত একজন চাই।

এসব ব্যাপারে নবাগত ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি একদমই নতুন, ঠিকমতো কোন বিষয়ই এখনও জেনে-বুঝে উঠতে পারিনি। তবে শুনছি পদ্মানদীর অভ্যন্তরে একটি গ্রুপ রয়েছে, যারা বালুমহাল দখলে নিতে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি ইতিমধ্যে নৌ-পুলিশসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি।’
ঈশ্বরদী লক্ষীকুন্ডা নৌপুলিশ ফাঁড়ির ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছি। বর্তমানে নদী এলাকায় আমাদের একটি টহল টিম রয়েছে। নতুন করে এ ধরণের কোনোকিছু যাতে ঘটতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।’
স্থানীয় এলাকাবাসী ও লক্ষ্মীকুন্ডা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির দেয়া তথ্য মতে, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব মো. মেহেদী হাসানের মালিকানাধীন এটি এন্টারপ্রাইজ পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এক বছরের জন্য পদ্মানদীর সাঁড়াঘাট ও পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের উত্তরপাড় পর্যন্ত তরিয়া মহলে খাজনা আদায়ের ইজারা নিয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা শাহজাহানপুরের শহিদবাগ এলাকার মো. হামিদ হাওলাদারের ছেলে মো. নাসির হাওলাদারের মালিকানাধীন গ্রুপঅন সার্ভিসেস প্রা. লি. এক বছরের জন্য পদ্মানদীর গোয়ালন্দ-পাকশী (রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নৌপোর্ট পর্যন্ত) নৌ-চ্যানেল চলাচলকারী নৌযান থেকে খাজনা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে ইজারা নিয়েছে। গ্রুপঅন সার্ভিসেসের পক্ষে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকার সোহেল খন্দকার খাজনা আদায় করছে।

সূত্র মতে, সোহেল খন্দকারের লোকজন নিজের সীমানা অতিক্রম করে এটি এন্টারপ্রাইজের তরিয়া মহলে এসে খাজনা আদায় করছে। এই নিয়ে দুই ইজারাদারের লোকজনের মধ্যে প্রায়ই ঝামেলা চলছিল। ঘটনার দিন তরিয়া মহলে নিজের সীমানায় খাজনা আদায় করে এটি এন্টারপ্রাইজের লোকজন সাঁড়ার ৫ নং ঘাটে স্পিডবোট রেখে পাড়ে উঠছিলেন। এই সময় সোহেল খন্দকারের লোকজন তাদের লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা বর্ষণ করে। এই গুলিতে নদী পাড়ের বাসিন্দা সজিব ও নিজাম গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়।
পতাকানিউজ/এসএমএইচ/এমওয়াই

