ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় অবস্থিত একটি পোশাক কারখানায় সংঘটিত হয় মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এ ঘটনার পার হয়েছে এক যুগ। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস নামের এই পোশাক কারখানায় ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সংঘটিত সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে অঙ্গার হন ১১৭ জন অসহায় পোশাক শ্রমিক। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী।
তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলার বিচার ১৩ বছরেও শেষ হয়নি, আর কবে নাগাদ শেষ হবে বলতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের যেমন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে, তেমনি আসামিদের আদালতে হাজিরা দেয়ার ভোগান্তি আছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার ফটক বন্ধ থাকায় জ্বলন্ত কারখানার আগুনে পুড়ে মরতে বাধ্য হন এই শ্রমিকরা। বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম এই ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী কারখানা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও, এখনও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ হত্যা মামলা দায়ের করলেও, এখনও হয়নি এই শতাধিক শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার।
মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নাসরিন জাহানের আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আছে। গত বছর তাজরীন ফ্যাশনসের ফিনিশিং সুপারভাইজার আমিনুর রহমান সাক্ষ্য দেন। এরপর আর কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। সবশেষ ১৮ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ছিল, তবে ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে আসেননি। বিচারক আগামী বছরের ৯ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুর রহমান বলছেন, ‘সাক্ষীদের প্রতি আদালত থেকে সমন ইস্যু করা হয়। সমন পৌঁছাতে পারেনি বা পায় না, কোনো কারণে হয়তো সাক্ষীরা তা পাচ্ছে না।’
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ৯৮৪ জন শ্রমিক সেখানে কর্মরত ছিলেন। নিহত ১১১ জনের মধ্যে তৃতীয় তলায় ৬৯ জন, চতুর্থ তলায় ২১ জন, পঞ্চম তলায় ১০ জন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ১১ জন মারা যান। শনাক্ত করা ৫৮টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি ৫৩ লাশ অশনাক্ত অবস্থায় জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার এস আই খায়রুল ইসলাম অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় নাশকতার পাশাপাশি অবহেলাজনিত মৃত্যুর (দণ্ডবিধির ৩০৪ ক) ধারা যুক্ত করা হয়। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি এ মামলার তদন্ত শুরু করে।
ঘটনার পর শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, আগুন লাগার পরও কারখানার ছয়টি ফ্লোরের কয়েকটিতে দরজা আটকে রাখা হয়েছিল, শ্রমিকদের নিচে নামতে দেয়া হয়নি। এছাড়া ওই কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারত বিধি অনুসরণ না করা এবং অবহেলারও প্রমাণ পাওয়া যায়।
এরপর সে বছর ২২ ডিসেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ও চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারসহ ১৩ জনকে আসামি করে পুলিশ যে অভিযোগপত্র দেয়, তাতে দণ্ডবিধির ৩০৪ ও ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ ও ‘অবহেলার কারণে মৃত্যুর’ অভিযোগ আনা হয়।
মামলার অভিযোগপত্র ও সিআইডির অনুসন্ধানে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কারখানা মালিক পক্ষের অবহেলাকেই দায়ী করা হয়। কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগপত্রে। এছাড়া শ্রমঘন শিল্প হিসেবে পরিচিত পোশাক কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত ভবনটিতে ছিলো না জরুরি বহির্গমন পথও। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচতলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাধা দিয়ে বলেন, আগুন লাগেনি, অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। এরপর কারখানার দরজা বন্ধ করে দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ।
এ মামলার বিচার বিষয়ে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ফরিদুর রহমান বলেন, ‘মামলাটা ২০১২ সালের। আগে যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা মামলাটিতে তেমন গুরুত্ব দেননি। একারণে মামলার বিচার আগায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাক্ষীদের আদালতে হাজির হতে সমন ইস্যু করা হচ্ছে। কিন্তু তারা আসছেন না। মামলার সাক্ষীও ১০৪ জন। এতো সাক্ষী শেষ করাও কঠিন। তারপরও আমরা সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করবো।’
আসামিদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তারের আইনজীবী হেলেনা পারভীন বলেন, ‘মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। সাক্ষীরা নিয়মিত আসছেন না। আসামিদের আদালতে হাজিরা দিয়ে যেতে হচ্ছে। আগুন লাগার ঘটনা একটা দুর্ঘটনা। মালিক হিসেবে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এজন্য তাদের আসামি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনায়। তারপরও তারা ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করছেন। মামলায় যা হওয়ার তা তো হবে। ন্যায়বিচার চায়। আশা করছি, ন্যায়বিচারে তারা খালাস পাবেন।’
তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার বলেন, ‘তাজরীনের অগ্নিকাণ্ড কোন দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কারণ কারখানাটিতে যখন আগুন লাগে তখন কারখানার সবগুলো দরজা খুলে না দিয়ে উল্টো মূল ফটকসহ গোডাউনের ফটক বন্ধ করে দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। এতে সেখানে আটকা পড়েন শত শত শ্রমিক।
শ্রমিকদের ভেতরে আটকে রেখে বাইরে থেকে এই দরজা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত তারা তো সুস্পষ্টভাবেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। দেশের প্রচলিত আইনে তো এতদিনে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। সরকারি দলের ছত্রছায়ায় ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে কারাগার থেকে সহজেই জামিন পেয়ে বের হয়ে আসে কারখানার মালিক ও এই হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি দেলোয়ার। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন মৎস্যজীবী লীগের ঢাকা মহানগরের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও উপহার দেয়া হয় তাকে।’
বারবার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের বিষয়টি পেছানোর প্রতিবাদ জানিয়ে বাবুল আক্তার বলেন, ‘আসামী পক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় এবং বিগত সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের আনুকূল্য পাওয়ায় বারবার সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বাধার সৃষ্টি করা হয়। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাবো, যেন রাষ্ট্রপক্ষ নিজ উদ্যোগে এবং খরচে মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পাশাপাশি দ্রুত এই মামলার শুনানি শেষ করে রায় ঘোষণার মাধ্যমে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান তিনি।’
পতাকানিউজ/এএইচ

