এক সময় সবজির ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের চকরিয়ার আকাশ এখন ধোঁয়ায় ঢেকে থাকে তামাক চুল্লির ধোয়ায়। মাতামুহুরী নদীর তীর, ফসলি জমি -মনকি সংরক্ষিত বনাঞ্চল পর্যন্ত দখল করে নিচ্ছে তামাকের খেত। অধিক মুনাফার প্রলোভনে কৃষকেরা সবজি ছেড়ে ঝুঁকছেন তামাকে। ফল এক সময়ের সবজির তীর্থস্থান খ্যাত চকরিয়ায় এখন চলছে স্থানীয় সবজির ঘাটতি, জমি হারাচ্ছে উর্বরতা। আর বনের কাঠ জ্বালানি হচ্চে তামাক চুল্লির।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নে বিস্তৃত হয়েছে তামাকের আবাদ। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। যার মধ্যে মাতামুহুরীর দুই তীরের অন্তত ১ হাজার একর খাস জমিও রয়েছে। বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের বমু বনবিট ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের মানিকপুর বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চল পর্যন্ত এই আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়েছে—যেখানে তামাক চাষে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নেই।
শুষ্ক মৌসুমে মাতামুহুরীর তীরবর্তী জমিতে একসময় বোরো ধান, রবিশস্য ও রকমারি শাক-সবজির চাষ হতো। পাশের জেলাগুলোতেও এখানকার সবজি সরবরাহ করা হতো। এখন সেই চাহিদা মেটাতে বাইরে থেকে সবজি আনতে হচ্ছে। কৃষক বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘তামাকে লাভ বেশি। এক কানি জমিতে ছয় মাসে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। সবজিতে এত থাকে না।’ লাভের এই অঙ্কই কৃষকদের টানছে।
অভিযোগ রয়েছে, তামাক কোম্পানিগুলো অগ্রিম টাকা, চারা ও পোড়ানোর সরঞ্জাম দিয়ে কৃষকদের চুক্তিবদ্ধ করছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হবে তামাক পাতা পোড়ানো। ইতোমধ্যে বনাঞ্চলের পাশেই গড়ে উঠছে অসংখ্য চুল্লি। স্থানীয় কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাঠ ছাড়া তামাকের মান ভালো হয় না—ভালো দাম পেতে হলে কাঠই লাগবে। অর্থাৎ হাজার হাজার মণ কাঠ জ্বালানোর প্রস্তুতি চলছে।
সংরক্ষিত বন ও নদীতীর দখল করে তামাক আবাদ হচ্ছে। এগুলো পোড়াতে বন উজাড় হবে। এখনই অভিযান না চালালে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু কৃষি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়—স্বাস্থ্য ও পরিবেশেরও বড় হুমকি। চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এম. আর. মাহমুদ বলেন, ‘সংরক্ষিত বন ও নদীতীর দখল করে তামাক আবাদ হচ্ছে। এগুলো পোড়াতে বন উজাড় হবে। এখনই অভিযান না চালালে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।’ তাঁর মতে, তামাক চাষে জমির উর্বরতা কমে যায়, পাশাপাশি চাষি ও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন।
জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাগুলোও সতর্ক করছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে এক লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে—হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায়। তামাকের কারণে চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস মিলিয়ে দেশের বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ মাঠের লাভের অঙ্ক শেষ পর্যন্ত সমাজের বড় ক্ষতিতে রূপ নেয়।
বাঁধা দিতে পারে না কৃষি অফিস
চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ২২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে। এসব জমিতে ধান, রবিশস্য ও সবজি উৎপাদনের কথা। তবে কত জমিতে তামাক চাষ হয়েছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানানো হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসি বলেন, ‘তামাক চাষ বন্ধে নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা নেই। তারপরও আমরা সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছি।’ তিনি মনে করেন, চাষিরা সচেতন না হলে বিকল্প ফসলের দিকে ঝোঁক বাড়বে না; আবাদি জমি কমলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে—নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষিত বন ও খাস জমিতে তামাক আবাদ কীভাবে চলছে? প্রশাসনিক নজরদারি কোথায়? স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ও কোম্পানির অর্থবল এই বিস্তারকে সহজ করেছে।
চকরিয়ার বাস্তবতা মূলত দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে তাৎক্ষণিক লাভের মোহ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবজির সবুজ মাঠ যদি পর্যায়ক্রমে তামাক আর ধোঁয়ার চুল্লি সচল থাকে, তাহলে এর মূল্য শুধু কৃষক নয়, পুরো জনপদকেই দিতে হবে।
প্রশাসন কাগুজে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মাঠে নামে, নাকি তামাকের আগ্রাসন আরও এক মৌসুম পার হয়ে স্থায়ী রূপ নেয় –সেটাই এখন দেখার বিষয়।
-পতাকানিউজ/এমজেসি

