তাসনিম তামান্না এখনো শিশু। তার বাবার মৃত্যু হয়েছে প্রায় এক মাস আগে বাহরাইনে। কিন্তু লাশের দেখা নেই। বিদেশেই ছিল লাশ। শেষ পর্যন্ত দেশে এসেছে বাবার কফিন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল খোলা যাবে না। -তাই কি হয়?
বাবাকে শেষ দেখা দেখবে না আদরের মেয়ে তাসনিম তামান্না? –চিকিৎসের বারণ শেষ পর্যন্ত বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারলো না। তাসনিম তামান্না দেখলো নিথর বাবার মুখ। এরপরই বাবাকে নিয়ে স্বজনেরা চলে গেছেন গোরস্থানে। দাফনের পর পৃথিবী ভ্রমণ শেষ করেছেন তামান্নার বাবা এস এম তারেক।
এস এম তারেক। ছিলেন বাহারাইন প্রবাসী। তাঁর বাড়ি সন্দ্বীপ। কিন্তু ভাড়া বাসায় পরিবার থাকে চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর ঈদগাহ বউবাজার এলাকায়। শনিবার সকালে তারেকের ভাড়া বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। সেখানেই সাদা কফিনে মোড়ানো তারেকের মরদেহ রাখা আছে।
আশপাশে আছেন স্বজনেরা। রাতে যখন মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স আঙ্গিনায় পৌঁছে তখনই একবার নিথর বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিল তামান্না। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসক যে আগে থেকেই বারণ করেছিল কফিন না খুলতে!
অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে স্বজনের শোকাহত অবস্থান। কারো চোখে পানি। কেউবা তারেক সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তারেক কিভাবে মারা গেল? –সেই বর্ণনা করছেন।
তারেকের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছে শুক্রবার সন্ধ্যায়। ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রামে পৌঁছে রাত আড়াইটার পর। সেখানে তোরেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও একমাত্র মেয়ে তাসনিম তামান্না ভাড়া বাসায় বাস করেন।
রাতে বাবাকে দেখতে না পারার বেদনা দূর হয় সকালে। বাবা যখন চিরতরে পৃথিবী ছেড়ে যাবেন-তার কিছুক্ষণ আগে। স্বজনকেরা কফিন খুলে দেখালেন তামান্নাকে। বাবাকে দেখে তামান্না বললো, ‘শেষবার বাবাকে দেখেছি, এটুকুই সান্ত্বনা।’ তামান্নার পাশে কান্নায় চোখ ভাসিয়ে স্বামীর মুখ দেখেছেন রোকেয়া বেগমও। শেষবার যখন তারেক বারাইন যাওয়ার জন্য বিদায় নিয়েছিল, সেইটিই যে শেষ বিদায় হয়ে যাবে- তখন বুঝতে পারেননি রোকেয়া বেগম।
স্বজনরা দেখার পর বেলা ১১টায় জানাজা শেষ তারেককে দাফন করা হয়।
তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন জানালেন দুঃখগাঁথা। বললেন, একমাস ধরে ভাই কফিনবন্দি। ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল কফিন না খোলার। তাই রাতে এসেও কফিন না খুলে বসেছিলাম। জানাজার আগে একটুখানি দেখেছি ভাইয়ের মুখ। এখন জানাজা পড়লাম, দেশের মাটিতে কবর দিলাম-এটুই স্বস্ত্বি। দোয়া করি, ভাইকে যেন আল্লাহ জান্নাতের বাসিন্দা করেন।
তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে প্রবাস জীবনে ছিলেন তারেক। মানামার আরসি ড্রাইডট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পাশাপাশি বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভিসা দিয়ে বাহারাইন যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এমন একজন পরোপকারী প্রবাসী চলে গেলেন যুদ্ধের বোমার আঘাতে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা লাশ গ্রহণ করেছেন। তারপর লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার এবং পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে সরকার। এর বাইরে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান আরো ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন এবং মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। এ জন্য সংসদ সদস্যের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
-পতাকানিউজ

