খুলনার কয়রায় একই কাজে বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক বরাদ্দ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কয়রা ইউনিয়নের টেপাখালী লঞ্চঘাট সংলগ্ন রাস্তা সংস্কারে একটি এনজিওর বরাদ্দের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার এবং উপজেলার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দ্বৈত বরাদ্দ দেয়া হয়। একই কাজ দেখিয়ে উভয় প্রকল্পের বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই কাজে দুই দপ্তরের বিল উত্তোলনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এদিকে পর্যাপ্ত বরাদ্দের পরেও কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় লঞ্চঘাটে যাত্রী ওঠানামায় এখনও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টেপাখালী লঞ্চঘাট উন্নয়নে তিন দপ্তর থেকে প্রকল্প দেয়া হয়। কয়রা উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা) এর আওতায় টেপাখালী লঞ্চঘাট মাটি ও ইট দ্বারা উন্নয়নে পাঁচ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। একই স্থানে এডিপির আওতায় বরাদ্দ দেয়া হয় এক লাখ ২৬ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় নাসির মাওলানার দোকান হতে লঞ্চঘাট অভিমুখে রাস্তা ইট দ্বারা উন্নয়ন। ইট দ্বারা উন্নয়নে এডিপি ও কাবিখার আওতায় দুটি প্রকল্প দেয়া হলেও একটি প্রকল্পের আওতায় কাজ করা হয়। প্রকল্প দুটি পিআইসি কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন দেখানো হয়। উভয় কমিটির সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ। তবে কাজের পাশে প্রকল্পের সাইনবোর্ড ছিল না। দুই দপ্তরের কাগজপত্রে একই স্থানের একই ধরনের কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
এডিপির কাজ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের বিলের ফাইলে কাজের আগের এবং পরের ছবির পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন, প্রাক্কলনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেয়া হয়। অপরদিকে, কাবিখার কাজ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা-পিআইও এর দপ্তরের বিলের ফাইলে চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র দেয়া হয়নি। পরে ওই দপ্তরের কর্মকর্তা কাজের আগের এবং পরের ছবি দেখাতে সক্ষম হন। যা হুবহু এডিপি প্রকল্পের ছবির সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন দেখাতে পারেননি।

এর আগে, সুন্দরবন কোয়ালিশন নামক একটি এনজিও থেকে মাটি দ্বারা উন্নয়নের জন্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করেন অরাবিয়ান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ওডিএফ) নামের স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা। কাজের পাশে তাদের সাইনবোর্ড রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভেকু মেশিন দিয়ে দুদিন নদীরচর থেকে মাটি কেটে রাস্তায় দেয়া হয়। পাশাপাশি ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক ৮ থেকে ১০ দিন কাজ করেন। এনজিওর কাজ বাস্তবায়নকারী সংস্থা অরাবিয়ান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক কমলেস মন্ডল বলেন, কাজটির ফান্ড রিসিভ করেন সিএনআরএস নামক একটি এনজিও। তারা এখন কয়রাতে নাই। আমরা তাদের হয়ে শুধুমাত্র তদারকির কাজ করি। ঠিকাদার নিয়োগ, ফান্ড রিসিভ, বিল প্রদান সব তারাই করেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, টেপাখালী মোড়ের মাওলানা নাসিরের দোকান থেকে লঞ্চঘাটের পল্টন পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১০০ মিটার। এর মধ্যে লঞ্চঘাট অভিমুখে ৬৫ মিটারের মতো রাস্তা মাটি, বালু ও ইট দ্বারা উন্নয়ন করা হয়েছে। বাকি রাস্তার উন্নয়ন না হওয়ায় যাত্রীদের কাঁদা মেখে পল্টনে উঠতে হচ্ছে। এতে নারী ও বয়স্কদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে দুর্ভোগের অন্ত নেই।
রাস্তাটি প্রথমে এনজিওর অর্থে মাটি দ্বারা উঁচু ও প্রশস্তের কাজ করা হয়। যে কাজে ১ লাখ টাকার মত ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। এরপর ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ দুপাশে সামান্য মাটি ও মাঝখানে বালু দিয়ে ইট বসানোর কাজ করেন। রাস্তাটি করতে চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার ইট ব্যবহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকার মত কাজ করেন বলে ধারণা করেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইউপি সদস্য হরেন্দ্র নাথ সদুত্তর না দিয়ে প্রকল্প নিতে ভুল হয়েছে স্বীকার করে ভিন্ন জায়গায় কাজ করার নয়ছয় তথ্য দেন।
জানতে চাইলে কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমাদের প্রকল্পের চাহিদা দেয়া হয়। পরবর্তীতে ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন, কাজের আগের-পরের ছবিসহ যাবতীয় কাগজপত্র যুক্ত করে বিল দাখিল করেন প্রকল্প সভাপতি। শুধু কাগজপত্র নয়, কাজ চলাকালীন সুপারভিশনের পাশাপাশি কাজ বুঝে নিয়ে বিল প্রদান করা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মামুনার রশিদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকল্প দাখিল করেন। ইউপি সদস্য কাজ সম্পন্ন করে বিল দাখিল করার পর আমরা বিল প্রদান করি। এডিপির কাজের বিষয়ে আমাদের জানা ছিল না। এখন জানতে পারছি এডিপির কাজ আমাদেরকে দেখানো হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কয়রা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান সরদার জানান, এডিপির প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় তিনি প্রত্যায়ন দেন। একই জায়গায় দুটা প্রকল্প তিনি দেননি। তিনি শুধু কাবিখার প্রকল্পটি দাখিল করেছিলেন। এডিপির প্রকল্প উপজেলা প্রশাসন থেকে দেয়া হয়।
কাবিখা প্রকল্পের কাজ না হওয়ার সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কাবিখা প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় প্রত্যয়ন দেয়া হয়নি। প্রকল্প সভাপতি কিভাবে বিল উত্তোলন করেছে এটা আমার জানা নেই।’
পতাকানিউজ/টিই/আরবি

