দম এমন একটি সিনেমা যা দর্শক হৃদয় জয় করতে সক্ষম। কারণ একটি সিনেমা তখনই দর্শক হৃদয় জয় করতে পারে যখন সেটি বিনোদন ছাড়িয়ে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের মনের গহীনের গল্প বলতে শুরু করে। সেই বিবেচনায় ‘দম’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি জটিল সামাজিক ও বৈশ্বয়িক জীবনের প্রতিচ্ছবি। দম ছবিতে বৈশ্বিক রাজনীতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং ব্যক্তি সম্পর্কের অদ্ভুদ জাল বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে দর্শকদের হৃদয়ে।
দম এমনই একটি সিনেমা, যেটিকে শুধু সিনেমা না বলে বলা যায় অন্য কিছু। ছবিতে সমাজ, রাজনীতি, প্রেম, সম্পর্ক, মানুষের ভেতরের ভয়ের গল্প উঠে এসেছে। মানুষের জীবন কিভাবে আটকে যায়? –সেই গল্পই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে এই সিনেমায়।
দম- এই সময়ের গল্প
সিনেমার গল্পের পরিধি বেশ বড় এবং শক্তিশালী। ধর্মীয় পরিচয়, বৈশ্বিক রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বহুমাত্রিক সংকট একাকারভাবে জড়িয়েছে। নির্মাতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বৈশ্বিক রাজনীতির খেলায় কোনো পক্ষই পুরোপুরি নির্দোষ নয়। বরং পরিস্থিতি কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে চরম সিদ্ধান্তও তার কাছে যৌক্তিক মনে হতে পারে।
সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— একটি বড় শক্তিধর দেশের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত কীভাবে হাজার মাইল দূরের একটি সাধারণ পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। একটি দৃশ্য থেকে এই ধারণাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পৃথিবীর ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে প্রান্তিক মানুষের ওপরই।
এখানে যেন একটি অদৃশ্য সংযোগ কাজ করে— পেন্টাগনের একটি সিদ্ধান্ত, আর বাংলাদেশের একটি গ্রামের এক গর্ভবতী নারীর জীবন। এই বৈপরীত্যই সিনেমাটিকে আলাদা করে।
গল্পের ভেতরে একটি রাজনৈতিক সাবটেক্সটও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সময় তৃতীয় বিশ্বের ‘অভিভাবক’ হিসেবে ভাবা হলেও, সিনেমার এক পর্যায়ে মনে হয়— দৃশ্যের আড়ালে আরও কোনো শক্তি কাজ করছে। একটি রহস্যময় ফোনকলের প্রসঙ্গ আসে, কিন্তু তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। এই অসম্পূর্ণতাই হয়তো দর্শককে ভাবানোর জন্য রেখে দেওয়া।
চলচ্চিত্রে ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গও এসেছে একাধিকবার। এটি শুধুই আবেগের জায়গা থেকে নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের আলোচনার অংশ হিসেবেই এসেছে। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় তুলে ধরা হয়েছে— বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক চর্চা কীভাবে অন্য অঞ্চলের রাজনৈতিক ইসলামের ব্যাখ্যা থেকে আলাদা।
তালেবান চরিত্রগুলোকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হলেও তাদের একেবারে একমাত্রিক করা হয়নি। এই জায়গায় নির্মাতার সংযম চোখে পড়ে। তবে রাজনৈতিক সংঘাতের জায়গায় পাকিস্তানকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে সুজিত ও নূরের বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক গল্পে একটি মানবিক ভারসাম্য তৈরি করে। এই সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজনের বদলে সহাবস্থানের একটি ছবি পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে যখন ধর্মীয় বিভাজনের আলোচনা বাড়ছে, তখন এই উপস্থাপনটি আলাদা গুরুত্ব পায়।

চলচ্চিত্রে সমাজের কিছু বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের ছায়াও খুঁজে পাওয়া যায়। সাংস্কৃতিক সংগঠন বা মুক্তচিন্তার জায়গাগুলো নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তার প্রতিধ্বনি যেন কোথাও কোথাও উপস্থিত।
অভিনয়ের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, আফরান নিশো তার চরিত্রে সংযত অভিনয় করেছেন। তার অভিব্যক্তিতে ভেতরের টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে চঞ্চল চৌধুরী পর্দায় কম সময় থাকলেও নিজের উপস্থিতি বোঝাতে পেরেছেন।
টেকনিক্যাল দিক থেকেও সিনেমাটি যত্নের পরিচয় দেয়। সিনেমাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং দৃশ্যের গঠন- সব মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের কাজ করার চেষ্টা চোখে পড়ে। বিশেষ করে বন্দিদশার দৃশ্যগুলোতে আলো ও শব্দের ব্যবহার প্রশংসার দাবি রাখে।
তবে এই সিনেমার আবেগের জায়গাটি মূলত সম্পর্কের গল্পে। বিশেষ করে ‘ফিরে আসা’ বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসার যে মানসিক টান, সেটিই নূরের চরিত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নূরের বেঁচে থাকার লড়াইটা নিজের জন্য যতটা না, তার চেয়ে বেশি তার স্ত্রী রানীর জন্য। এই আবেগটি সিনেমাটিকে রাজনৈতিক গল্পের বাইরে এনে একেবারে ব্যক্তিগত জায়গায় নিয়ে আসে।
রানীর চরিত্রটিও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। তাকে নিছক অপেক্ষমাণ স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার আবেগ, ভয় এবং অধিকারবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলধারার বাংলা সিনেমায় এ ধরনের নারী চরিত্র খুব বেশি দেখা যায় না।
সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় পরিচালক মণিরত্নমের কিছু কাজের কথা মনে পড়তেই পারে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত ভালোবাসার সংঘাতের বিষয় আসে। তবে দম নিজের মতো করেই গল্প বলতে চেয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে সিনেমাটি দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে- এটি আসলে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছার গল্প। চরম পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে স্মৃতি, ভালোবাসা বা আশা আঁকড়ে ধরে টিকে থাকে- সেটাই এখানে মূল বিষয়।
এই জায়গায় হলিউডের ১২৭ ঘণ্টা সিনেমার কথাও মনে পড়তে পারে। সেখানে যেমন একাকিত্বের মধ্যে স্মৃতি একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, এখানেও তেমন কিছু প্রতীকী উপস্থাপন দেখা যায়। যেমন- একটি সোয়েটার, একটি স্মৃতি, কিংবা কল্পনায় ফিরে আসা প্রিয় মুখ।
তবে সব দিক মিলিয়ে বলতে গেলে, কিছু জায়গায় বন্দিদশার মানসিক চাপ আরও গভীরভাবে দেখানো গেলে নাটকীয়তা বাড়তে পারত। রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক হতে পারে- সেটি স্বাভাবিক। বরং এই বিতর্কই প্রমাণ করে সিনেমাটি আলোচনার জায়গা তৈরি করতে পেরেছে।
শেষে বলা চলে, দম হয়তো নিখুঁত সিনেমা নয়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সিনেমার মধ্যে অন্যতম বড় প্রচেষ্টা। গল্পের পরিসর আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নেওয়া হয়েছে। মানবিকতার স্থান উঁচুতে রাখা হয়েছে এবং প্রেমের গল্পকে চূড়ান্তরূপ দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে দম দেখতে দেখতে যেন দর্শকদের দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা।
-পতাকানিউজ

