চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে খোন্দকার মাহমুদুল হাসান যোগ দিয়েছেন গত ১ আগস্ট। মাত্র ১২ দিনের মাথায় তিনি একটি অফিস আদেশ জারি করে নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মিজানুর রহমানকে প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিস থেকে এমন চিঠি ইস্যুর পরদিনই প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে, ইউএনও কী করলেন এটা? দায়িত্ব নিয়েই বড় উপহার দিলেন একজন যুবলীগ নেতাকে!
নলুয়ার সাবেক ও বর্তমান একাধিক জনপ্রতিনিধি অভিযোগের তীর তুলে পতাকানিউজকে বলেছেন, ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় নলুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানকে ‘পুনর্বাসন’ করেছেন প্যানেল চেয়ারম্যান পদ উপহার দিয়ে।
তাঁদের ভাষ্য, এই মিজানের কর্মকাণ্ডে ইউনিয়নের মানুষ বিরক্ত। প্যানেল চেয়ারম্যান করতে হলে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তুলনামূলক কম বিতর্কিত সদস্যকে বেছে নেয়ার সুযোগ ছিল। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ‘ভোট ডাকাতির’ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে ওই ইউনিয়নের সাবেক একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ৮ মেম্বারের বেশিরভাগই আওয়ামী ঘরানার।
‘বিদ্যমানদের মধ্যে তুলনামূলক ভালো কে?’- এমন প্রশ্নের জবাবে ওই জনপ্রতিনিধি বলেন, আওয়ামী ঘরানার হলেও একজন মেম্বার আছেন তুলনামূলক ভালো। তিনি ৫ দফায় মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন।’
ইউএনও স্বাক্ষরিত চিঠিতে ভাষ্য এরকম : ‘নলুয়া ইউনিয়নের ৮ জন সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সেবা ও নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখার নিমিত্তে জনস্বার্থে এবং নাগরিক দুর্ভোগ এড়ানোর জন্য উত্তরাধিকার সনদ, ওয়ারিশ সনদ প্রদান ও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকছে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) হাতে।’
ইউএনও কার্যালয়ের এমন আদেশ পেয়েই খুশিমনে কাজ শুরু করেছিলেন মো. মিজানুর রহমান। কিন্তু তার পরিষদের সদস্যদের কেউ কেউ এখন অভিযোগ করছেন, প্রভাব বিস্তার করে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে এবং ইউএনও কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে মিজান সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, আওয়ামী লীগ আমলে মিজানের দাপুটে অবস্থান ছিল এলাকায়।
মিজান নলুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মরফলা শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদের সভাপতি পদে দায়িত্বরত ছিলেন। তখনকার সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন নদভী, আবার কখনো সাবেক শ্রমপ্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম চৌধুরীর দাপটের কেতন ওড়াতেন এলাকায়।

ওই সময়ে প্রতিমন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সখ্যর নানান ছবি পতাকানিউজের কাছে পাঠিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, ৫ আগস্টের পর এই মিজানই এখনই জামায়াতপন্থী স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছেন। এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে কৌশলে প্যানেল চেয়ারম্যান পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। আর যে ৮ ইউপি মেম্বারের স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, সে-কাজেও একাধিক ইউপি সদস্যকে ‘চাপ’ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের মোট মেম্বার ১২ জন। এর মধ্যে মিজান নিজেই নিজের আবেদনের স্বপক্ষের স্বাক্ষর করেছেন। অন্যদের মধ্যে মোজাম্মেল হক, মো. শহিদুল্লাহ, নুরুল কবির ও ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার নজরুল ইসলাম স্বাক্ষর দেননি। তবে নজরুল ইসলাম নির্বাচনের ৫ মাস পরে বিদেশে চলে যান বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীও পালিয়ে সৌদি আরবে চলে যান।
কয়েকজন ইউপি সদস্যকে চাপ দিয়ে আবেদনে সই নেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মো. মিজানুর রহমান পতাকানিউজককে বলেন, ‘কাউকে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর নিইনি। আমার বিরুদ্ধে সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি এখন সৌদি আরবে পলাতক রয়েছেন। আগে আমাকে হেনস্তা করেছিলেন। এখনো হেয় করার চেষ্টা করছেন।’
যুবলীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মরফলা শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘আমি নিরীহ, নির্যাতিত।’ দায়িত্ব নিতে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সহযোগিতা নেয়ার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, ‘ইউপি মেম্বারদের আবেদনের ভিত্তিতেই আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি কোনো দলীয় কারো সহযোগিতা নিইনি।’
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১২ দিনের মাথায় যুবলীগ নেতাকে ‘প্যানেল চেয়ারম্যানের’ দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান পতাকানিউজকে বলেন, ‘ আমি যোগদানের আগে থেকেই এই ফাইলের কার্যক্রম চলছিল। ওই ইউনিয়নের ৮ সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক দুর্ভোগ এড়াতে জনস্বার্থে একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, ‘চিঠি দেয়ার আগে আমি প্রাথমিক খোঁজখবর নিয়েছিলাম; ইউপি সদস্যদের আবেদনের ভিত্তিতে জনস্বার্থে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’
এখন ইউপি সদস্যের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন- এমন তথ্য জানানোর পর তিনি বলেন, ‘আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করার পর যদি এখন ভিন্ন বক্তব্য দেন, তাহলে তো বিষয়টি কঠিন হয়ে যায়।’
যে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মো. মিজানকে প্যানেল চেয়ারম্যনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলা হচ্ছে, সেই আবেদনপত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদনপত্রটি জমা দেয়া হয় গত ১৫ জুন। তখন ইউএনওর দায়িত্বে ছিলেন মিল্টন বিশ্বাস। কিন্তু তিনি সেটি অনুমোদন করে যাননি। সেই আবেদনপত্রটি দাপ্তরিক নানান ধাপ পেরিয়ে চিঠি আকারে ইস্যু হয় গত ১২ আগস্ট। এরই মধ্যে বদলি হয়ে যান মিল্টন বিশ্বাস। নতুন দায়িত্বে আসেন খোন্দকার মাহমুদুল হাসান। সর্বশেষ তার হাতেই চিঠিটি স্বাক্ষরিত হয়।
পতাকানিউজ/এসএমআর

