ইতিহাসের কঠিন সময় পার করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রথম ধাক্কাতেই শহীদ হয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর তার অনুগতরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। এরই মধ্যে শীর্ষ নেতার পদটি শূন্য রয়েছে। সেটি পূরণ করাও জরুরি। সেই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে ইরানের ৮৮ সদস্যের শক্তিশালী ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নতুন নেতা নির্বাচন করেছেন খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে।
মোজতবা খামেনি এখন ইরানের নতুন নেতা। নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ আর বারুদের গন্ধ নাকে নিয়েই তাঁকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। তার এই যাত্রাপথ কতোটা ভঙ্গুর, সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। কিন্তু এখন তাকে চোখ দিতে হচ্ছে যুদ্ধজয়ের দিকে। এর সঙ্গে আছে অভ্যন্তরীণ কিছু বিরোধ, বিশ্বের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত উনুনে দাঁড়িয়ে ইরানকে জয়ী করার দূরত্ব যাত্রার সব আয়োজনই করতে হচ্ছে নতুন এই নেতাকে। যিনি ব্যক্তিগত জীবনে এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
বলা হচ্ছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা গত পাঁচ দশকের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। সেই প্রেক্ষাপটে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দেশটির তৃতীয় সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই পদে এর আগে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং তার উত্তরসূরি আলী খামেনি।
রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় নতুন নেতৃত্ব
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে ৮৮ সদস্যের শক্তিশালী ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’। এই পরিষদের সিদ্ধান্তেই মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
তার দায়িত্ব গ্রহণের খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই ইরানের বিভিন্ন শহরে বিপ্লবপন্থি সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয় এবং ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে সমর্থন জানান নতুন নেতাকে।
দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকেও আনুগত্যের ঘোষণা এসেছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসসহ প্রধান নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নতুন কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে মোজতবার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত দৃশ্যেও দেখা গেছে, তার নাম লিখে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে—যা প্রতীকীভাবে নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পেছনের প্রেক্ষাপট
মোজতবা খামেনির উত্থান মূলত তার পারিবারিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ফল বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তিনি প্রয়াত আলী খামেনির দ্বিতীয় সন্তান এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাবার রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরেই কাজ করেছেন।
ইরানের ক্ষমতার কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার গভীর ধারণা রয়েছে বলে জানা যায়। বহু বছর ধরে তিনি আড়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে ধারণা রয়েছে।
সামরিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
মোজতবা খামেনির সঙ্গে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কৈশোরেই তিনি এই বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন।
পরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি যান কোম শহরে, যা শিয়া ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে ধর্মতত্ত্বের ওপর পড়াশোনা করে তিনি নিজেকে ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করেন।
ইসলামিক বিপ্লবের পর গঠিত রেভল্যুশনারি গার্ড এখন শুধু সামরিক বাহিনী নয়; ইরানের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত নীতি নির্ধারণেও তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই শক্তিশালী বাহিনীর সমর্থন পাওয়া মোজতবার ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেই দায়িত্ব
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের আগে মোজতবা খামেনি নিজেও এক ভয়াবহ ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে গেছেন। ইসরায়েলি হামলায় তিনি শুধু তার বাবাকেই হারাননি; একই ঘটনায় তার মা মানসুরে খোজাস্তে বাঘেরজাদে, স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং তার এক সন্তানও নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হলেও তার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ওই হামলার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে খুব একটা দেখা দেননি, ফলে তাকে ঘিরে রহস্যও বেড়েছে।

সমর্থনের পাশাপাশি বিরোধিতা
নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে ইরানের ভেতরেও মতবিরোধ রয়েছে। সরকারপন্থি গোষ্ঠী যেখানে তাকে বিপ্লবের ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে দেখছে, সেখানে সংস্কারপন্থি ও সরকারবিরোধী অনেকেই তার উত্থানকে সমালোচনা করছেন।
গত কয়েক বছরে ইরানে যে আন্দোলনগুলো হয়েছে, সেখানে অংশ নেওয়া অনেকেই এখনো বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, নতুন নেতৃত্ব আসার পর পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারে।
রাজপথে কিছু বিক্ষোভকারীর স্লোগানেও এই বিরোধিতার প্রতিফলন দেখা গেছে। তাদের দাবি, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক চাপ ও হুমকি
মোজতবা খামেনির নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ক্ষমতায় আসাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই নেতৃত্ব পরিবর্তন অঞ্চলটির জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও তাকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা এখন তাদের নজরে রয়েছেন এবং প্রয়োজনে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে মোজতবা খামেনি আপাতত অনেকটাই আড়ালে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও জোট
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোজতবা খামেনির সঙ্গে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম আলী লারিজানি, যিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ বাকের কালিবফ, যিনি বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।
এই দুই নেতাকে ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। ফলে মোজতবার নেতৃত্বে তাদের প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অতীতের বিতর্ক
মোজতবা খামেনির নাম অতীতেও রাজনৈতিক বিতর্কে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় এবং ২০০৯ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের সময় তার ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর যে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা পরে ‘গ্রিন রেভল্যুশন’ নামে পরিচিত হয়। সে সময় ইরানের সংস্কারপন্থি নেতাদের অনেকে গৃহবন্দি হন। এই ঘটনাগুলো ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে ইরান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতেরও অংশ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাত ইরানের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে দেশটি এখন অনিশ্চিত সময় পার করছে।
তবে মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রাজনীতিবিদ দাবি করেছেন, তিনি তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী এবং প্রয়োজন হলে সংস্কারের পথও বিবেচনা করতে পারেন।
কিছু বিশ্লেষক তাকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তুলনা করেছেন—যিনি শক্তিশালী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেও সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এনেছেন।
তবে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়। বরং যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে নতুন সর্বোচ্চ নেতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশকে স্থিতিশীল রাখা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখা।
এই বাস্তবতায় মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।
-সূত্র : বিবিসি
-পতাকানিউজ

