চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রকদের একজন সারোয়ার বাবলা। তার প্রতিপক্ষ ছিল দুই সাজ্জাদ। বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদ হিসেবে সমধিক পরিচিত এই দুই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সারোয়ারের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। অথচ একটা সময় সারোয়ার এবং আরেক সন্ত্রাসী ম্যাক্সন ছিল বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ট সহযোগী। পরবর্তীতে তাদের পথ ভিন্ন হয়- স্বার্থের দ্বন্দ্বে।
বুধবার, ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চালিতাতলী এলাকায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম ৮ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে প্রচারণায় উপস্থিত ছিলেন সারওয়ার। দুই সাজ্জাদের বাড়িও চালিতাতলী এলাকায়।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এরশাদ উল্লাহর খুব কাছেই উপস্থিত ছিলেন সাদা পোশাকের সারোয়ার। পেছন থেকে একজন পিস্তল বের করে সারোয়ারের ঘাড়ে পরপর গুলি ছুঁড়ে। সেই গুলিতে বিদ্ধ হয়ে মারা যান সারোয়ার। আর আহত হয়ে হাসপাতালে যান এরশাদ উল্লাহ।
চট্টগ্রাম মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিত অবনতিশীল। – দীর্ঘদিন ধরে এমন আলোচনার মধ্যেই বিএনপিকে মূল্য দিতে হলো দলটির আহ্বায়ক এবং সম্ভাব্য প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। আহত এরশাদ উল্লাহ এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর নিহত সারোয়ার বাবলার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
সারোয়ার বাবলা মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে পতাকানিউজের সঙ্গে তার এবং প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিষয়ে কথা বলেন। এই সময় নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন আলোচিত এই সন্ত্রাসী। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তার জীবনের জন্য হুমকি হিসেবে ‘বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের’ নাম উল্লেখ করেছিল। অবশ্য, মৃত্যুর পর সারোয়ারের বাবাও হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ছেলে হত্যার জন্য সাজ্জাদদের দায়ী করে বক্তব্য দেন।
পতাকানিউজকে কী বলেছিলেন সারোয়ার
পতাকানিউজ : সদ্য বিয়ে করলেন। নতুন জীবন কেমন যাচ্ছে?
সারোয়ার : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। বয়স তো অনেক হলো। এখন বাবা হতে চাই। তাই বিয়ে করলাম। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
পতাকানিউজ : রাজনৈতিক অনেক নেতাকে দেখলাম অনুষ্ঠানে।
সারোয়ার : বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী এবং আবু সুফিয়ান থেকে শুরু করে অনেকেই এসেছেন। দোয়া করেছেন।
পতাকানিউজ : দীর্ঘকাল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। একাধিক মামলায় কারাভোগ করেছেন। এখন কি নিজকে নিরাপদ মনে করছেন?
সারোয়ার : না। নিজকে মোটেই নিরাপদ মনে করছি না। শত্রুরা সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে আছে। বড় সাজ্জাদ ভারতে বসে নিশানায় রেখেছে। ছোট সাজ্জাদ তো সেদিন বাকলিয়ায় মেরেই ফেলেছিল। আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি।
পতাকানিউজ : এক সময় তো আপনিও বড় সাজ্জাদের ছায়াসঙ্গী ছিলেন। এখন কেন বড় সাজ্জাদের নামে বদনামি করছেন?
সারোয়ার : বদনামি কই করলাম। সত্যটাই বলেছি। এখন বড়-ছোট দুই সাজ্জাদই আমার পেছনে লেগেছে। কারণ, আমি এখন ভালো হয়ে গেছি। ভালো হওয়াটাই আমার অপরাধ।
পতাকানিউজ : কই ভালো হলেন? আপনার বিরুদ্ধে এখনো তো চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। কয়েকদিন আগে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন?
সারোয়ার : আমি কোনো ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করিনি। তবে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে আরেকজনের আর্থিক লেনদেন আছে। আমি সেটা মিটমাট করে দিতে চেয়েছিলাম।
পতাকানিউজ : বড় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে আপনার এতো অভিযোগ কেন?
সারোয়ার: বড় সাজ্জাদ ভারতে বসে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি করছে। টোকাই পোলা নিয়োগ দিয়ে যখন তখন যে কাউকে গুলি করাচ্ছে। পুলিশ বড় সাজ্জাদের টোকাই বাহিনীকে ধরে না। আবার ছোট সাজ্জাদেরও একই অবস্থা। বড় সাজ্জাদের হয়ে সব কাজ করে। পুরো চট্টগ্রামে দুই সাজ্জাদ সন্ত্রাসী করছে। আমি এসবের প্রতিবাদ করি। তাই আমাকে তারা শত্রু মনে করছে।
পতাকানিউজ : কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তো আপনাকেও সাজ্জাদদের মাপের সন্ত্রাসী বলে জানিয়েছে।
সারোয়ার: আমাকে পুলিশ আগে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলাম। শেষে জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন ভালো হতে চাইছি। তবে পুলিশের খাতায় তো নাম আছে। তাই হয়তো আমাকেও সন্ত্রাসী বলছে। কিন্তু বাস্তবে আমি এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করি না।
কে এই সারোয়ার বাবলা
সারোয়ার বাবলার পরিচিতি ছিল ছাত্রশিবির ‘ক্যাডার’ হিসেবে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা ছিল। ওই সব মামলা থেকে জামিন পেয়ে এক সময় কাতার প্রবাসে চলে গিয়েছিল। ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ফেরার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সারোয়ার আটক করেছিল ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ তাকে নিয়ে বায়েজিদ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি একে-২২ রাইফেল এবং গুলি উদ্ধার করেছিল। সেই মামলা থেকে জামিন পায় সারোয়ার।
অবশ্য, অনেক আগে থেকেই আরেক শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেনের সহযোগী হিসেবে সারওয়ারের পরিচিতি ছিল। এই সাজ্জাদ আট খুনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি এখন ভারতে অবস্থান করছেন।
বড় সাজ্জাদ ভারতে অবস্থান করলেও তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদ চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এখন সে কারাবন্দি। তবে কারাগারে বসেই চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ছোট সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
পতাকানিউজ/কেএস

