ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি–এর চাকতাই শাখার ঋণ কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে যে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), তাতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে। প্রায় ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের এই ঘটনায় দুদক যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে, তখন উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ওই তদন্ত থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার ‘বিশেষ অনুরোধ’ জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—এটি সরাসরি দুদকের কাজে হস্তক্ষেপ।
দুদকের নথি বলছে, ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর চাকতাই শাখায় একটি নতুন হিসাব খোলা হয়। মাত্র ৯ দিন পর সেই হিসাব থেকেই ৮৯০ কোটি টাকার ঋণ চাওয়া হয়। আবেদন যাচাই–বাছাই ছাড়াই শাখা অফিস তা পাঠিয়ে দেয় প্রধান কার্যালয়ে। এরপর নকল দলিলপত্র তৈরি, অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ও ঋণ মঞ্জুর—সব কিছু সম্পন্ন হয় মাত্র ২১ দিনের মধ্যে। ২১, ২২, ২৩ এবং ২৬ ডিসেম্বর—এই চার দিনে পুরো ৮৯০ কোটি টাকা ছাড়ও হয়ে যায়। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ গ্রাহকের আমানত ঝুঁকিতে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতিও হয়।
অনিয়মের প্রমাণ মিলতেই গত ডিসেম্বরে ৫৮ জনকে আসামি করে মামলা করে দুদক। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা বা যোগসাজশেরও প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
দুদকের তালিকায় থাকা কর্মকর্তারা হলেন— প্রধান কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক লেনিন আজাদ পলাশ, অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ, অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুর হোসেন খান; চট্টগ্রাম কার্যালয়ের চার যুগ্ম পরিচালক সুনির্বাণ বড়ুয়া, মো. জোবাইর হোসেন, অনিক তালুকদার ও রুবেল চৌধুরী। এ ছাড়া আরও একজন তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক আছেন, যিনি বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক।
এই ৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠির সঙ্গে তাদের দায়িত্ব ও সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ১৪ পাতার বিশদ নথিও পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক এসব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি ও সম্পদের বিবরণ চেয়ে একাধিকবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পত্র পাঠায়। তথ্য চাওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক আংশিক জবাব দেয় এবং সময় বাড়ানোর আবেদন করে। পরে ১৩ আগস্ট দুদক জানায়, প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু দুদকের চিঠির জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোনো কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান থেকে ওই ৮ কর্মকর্তাকে ‘অব্যাহতি’ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
এই চিঠিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করে, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দায় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকদের নয়।
আইনজীবী, দুর্নীতি–বিরোধী কর্মী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এই চিঠি দুদকের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমি বলেন, অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান দুদকের এখতিয়ার, এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। কারও অনুরোধ মানার বাধ্যবাধকতাও দুদকের নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেআইনিভাবে নিজের কর্মকর্তাদের রক্ষার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, শত কোটি টাকার অনিয়মের পরেও দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়মুক্তি চাওয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।
মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা অনুরোধ জানিয়েছে। দুদক চাইলে গ্রহণ করবে, নইলে করবে না। তার মতে, অভিযোগগুলো ব্যক্তিগত নয়, অফিসিয়াল কাজের প্রক্রিয়া থেকে এসেছে, তাই প্রতিষ্ঠান মতামত দিয়েছে।
তবে দুদকের চাওয়া সম্পদের বিবরণ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন—পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি আছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধানাধীন ব্যক্তিদের দায়মুক্তি চাওয়া নজিরবিহীন। এতে দুদকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়, তদন্ত ব্যাহত হয়, আর এতে ‘ইনডাইরেক্ট প্রেসার’-এর স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে।
এই কেলেঙ্কারি শুধু ব্যাংকিং খাতেই নয়, রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপরও প্রশ্ন তুলেছে। দুদক এখন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে মামলার ভবিষ্যৎ—এবং এ ধরনের আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কতটা কঠোর অবস্থানে আছে, তাও পরীক্ষা হয়ে যাবে।
পতাকানিউজ/এনটি

